যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে, অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে -

Sunday, 17 June 2012

পথহারা পাখি

পথহারা পাখি কেঁদে ফিরি একা
আমার জীবনে শুধু আঁধারের লেখা

বাহিরে অন্তরে ঝড় উঠিয়াছে
আশ্রয় যাচি হায় কাহার কাছে!

বুঝি দুখ নিশি মোর
হবে না হবে না ভোর
ফুটিবে না আশার আলোক রেখা।।

তুমি আমার সকালবেলার সুর

তুমি আমার সকালবেলার সুর
বিদায় আলোয় উদাস করা অশ্রুভারাতুর।

ভোরের তারার মতো তোমার সজল চাওয়ায়
ভালোবাসা চেয়ে সে যে কান্না পাওয়ায়
রাত্রিশেষের চাঁদ তুমি গো, বিদায়বিধুর।

তুমি আমার ভোরের ঝরা ফুল
শিশির নাওয়া শুভ্রশুচি পূজারিণীতুল।

অরুণ তুমি তরুণ তুমি করুণ তারও চেয়ে
হাসির দেশে তুমি যেন বিষাদ লোকের মেয়ে
তুমি ইন্দ্রসভার মৌনবীণা নীরবনিঠুর।।

তিলক দিলে কি শ্যাম

তিলক দিলে কি শ্যাম ত্রিলোক ভুলাতে?
কে দিল বনমালী বনমালা গলাতে?

আঁখি যেন ঢলঢল আধফোটা শতদল
কে শিখাল ও চাহনি গোপিনী ছলিতে?

গভীর রাতে জাগি

গভীর রাতে জাগি খুঁজি তোমারে
দূর গগনে প্রিয় তিমির-পারে।

জেগে যবে দেখি বঁধু তুমি নাই কাছে
আঙিনায় ফুটে ফুল ঝরে পড়ে আছে
বাণ-বেঁধা পাখী সম আহত এ প্রাণ মম
লুটায়ে লুটায়ে কাঁদে অন্ধকারে।

মৌনা নিঝুম ধরা ঘুমায়েছে সবে
এসো প্রিয় এই বেলা বক্ষে নীরবে।

কত কথা কাঁটা হয়ে বুকে আছে বিঁধে
কত আভিমান কত জ্বালা এই হূদে
দেখে যাও এসো প্রিয় কত সাধ ঝরে গেল
কত আশা মরে গেল হাহাকারে।।

কেমনে রাখি আঁখিবারি চাপিয়া

রাগ - রাগেশ্রী

কেমনে রাখি আঁখিবারি চাপিয়া
প্রাতে কোকিল কাঁদে, নিশীথে পাপিয়া।

এ ভরা ভাদরে আমারি মরা নদী
উথলি উথলি উঠিছে নিরবধি
আমার এ ভাঙ্গা ঘাটে আমার এ হূদি তটে
চাপিতে গেলে ওঠে দুকুল ছাপিয়া।

নিষেধ নাহি মানে আমার এ পোড়া আঁখি
জল লুকাব কত কাজল মাখি মাখি
ছলনা করে হাসি অমনি জলে ভাসি
ছলিতে গিয়া আসি ভয়েতে কাঁপিয়া।।

আমার কালো মেয়ে

আমার কালো মেয়ে রাগ করেছে
কে দিয়েছে গালি
তারে কে দিয়েছে গালি
রাগ করে সে সারা গায়ে
মেখেছে তাই কালি।

যখন রাগ করে মোর অভিমানী মেয়ে
আরো মধুর লাগে তাহার হাসিমুখের চেয়ে
কে কালো দেউল করে আলো
অনুরাগের প্রদীপ জ্বালি।

পরেনি সে বসনভূষণ, বাঁধেনি সে কেশ
তারি কাছে হার মানে রে ভুবনমোহন বেশ।

রাগিয়ে তারে কাঁদি যখন দুখে
দয়াময়ী মেয়ে আমার ঝাঁপিয়ে পড়ে বুকে
আমার রাগী মেয়ে, তাই তারে দিই
জবা ফুলের ডালি।।

Saturday, 16 June 2012

আসিবে তুমি জানি প্রিয়

আসিবে তুমি জানি প্রিয়
আনন্দে বনে বসন্ত এলো
ভুবন হল সরসা, প্রিয়-দরশা, মনোহর।

বনানতে পবন অশান্ত হল তাই
কোকিল কুহরে, ঝরে গিরি নির্ঝরিণী ঝর ঝর।

ফুল্ল যামিনী আজি ফুল সুবাসে
চন্দ্র অতন্দ্র সুনীল আকাশে
আনন্দিত দীপান্নিত অম্বর।

অধীর সমীরে দিগঞ্চল দোলে
মালতী বিতানে পাখি পিউ পিউ বোলে
অঙ্গে অপরূপ ছন্দ আনন্দ-লহর তোলে
দিকে দিকে শুনি আজ আসিবে রাজাধিরাজ
প্রিয়তম সুন্দর।।

এ কুল ভাঙ্গে ও কুল গড়ে

এ কুল ভাঙ্গে ও কুল গড়ে
এই তো নদীর খেলা (রে ভাই)
এই তো বিধির খেলা।
সকাল বেলার আমির রে ভাই
ফকীর সন্ধ্যাবেলা।

সেই নদীর ধারে কোন ভরসায়
(ওরে বেভুল) বাঁধলি বাসা সুখের আশায়
যখন ধরল ভাঙন পেলিনে তুই
পারে যাবার ভেলা।

এই দেহ ভেঙ্গে হয় রে মাটি
মাটিতে হয় দেহ
যে কুমোর গড়ে সেই দেহ
তার খোঁজ নিল না কেহ।

রাতে রাজা সাজে নট-মহলে
দিনে ভিক্ষা মেগে পথে চলে
শেষে শ্মশান-ঘাটে গিয়ে দেখে
সবই মাটির ঢেলা
এই তো বিধির খেলা রে ভাই
ভব-নদীর খেলা।।

ওই ঘর ভুলানো সুরে

ওই ঘর ভুলানো সুরে
কে গান গেয়ে যায় দূরে
তার সুরের সাথে সাথে
মোর মন যেতে চায় উড়ে।

তার সহজ গলার তানে
সে ফুল ফোটাতে জানে
তার সুরে ভাটির টানে
নব জোয়ার আসে ঘুরে।

তার সুরের অনুরাগে
বুকে প্রণয়-বেদন জাগে
বনে ফুলের আগুন লাগে
ফুল সুধায় ওঠে পুরে।

বুঝি সুর সোহাগে ওরই
পায় যৌবন কিশোরী
হিয়া বুঁদ হয়ে গো নেশায়
তার পায়ে পায়ে ঘুরে।।

বঁধু, মিটিলনা সাধ

বঁধু, মিটিলনা সাধ ভালোবাসিয়া তোমায়
তাই আবার বাসিতে ভালো আসিব ধরায়।

আবার বিরহে তব কাঁদিব
আবার প্রণয় ডোরে বাঁধিব
শুধু নিমেষেরি তরে আঁখি দুটি ভ’রে
তোমারে হেরিয়া ঝ’রে যাব অবেলায়।

যে গোধূলি-লগ্নে নববধূ হয় নারী
সেই গোধূলি-লগ্নে বঁধু দিল আমারে গেরুয়া শাড়ি

বঁধু আমার বিরহ তব গানে
সুর হয়ে কাঁদে প্রাণে প্রাণে
আমি নিজে নাহি ধরা দিয়ে
সকলের প্রেম নিয়ে দিনু তব পায়।।

ভুলিতে পারিনে তাই

ভুলিতে পারিনে তাই আসিয়াছি পথ ভুলি
ভোলো মোর সে অপরাধ, আজ যে লগ্ন গোধূলি।

এমনি রঙিন বেলায় খেলেছি তোমায় আমায়
খুঁজিতে এসেছি তাই সেই হারানো দিনগুলি।

তুমি যে গেছ ভুলে, ছিল না আমার মনে
তাই আসিয়াছি তব বেড়া দেওয়া ফুলবনে
গেঁথেছি কতই মালা এই বাগানের ফুল তুলি
আজও হেথা গাহে গান আমার পোষা বুল্‌বুলি।

চাহ মোর মুখে প্রিয়, এস গো আরও কাছে
হয়তো সে দিনের স্মৃতি তব নয়নে আছে
হয়তো সে দিনের মতই প্রাণ উঠিবে আকুলি।।

মধুকর মঞ্জীর বাজে

মধুকর মঞ্জীর বাজে বাজে গুন্‌ গুন্‌ মঞ্জুল গুঞ্জরণে
মৃদুল দোদুল নৃত্যে বন শবরী মাতে কুঞ্জবনে।

বাজায়ছে সমীর দখিনা
পল্লবে মর্মর বীণা
বনভুমি ধ্যান-আসীনা
সাজিল রাঙা কিশলয় বসনে।

ধূলি-ধূসর প্রান্তর পরেছিল গৈরিক সন্ন্যাসী সাজ
নব দূর্বাদল শ্যাম হলো আনন্দে আজ।

লতিকা বিতানে ওঠে ডাকি
মুহু মুহু ঘুমহারা পাখি
নব নীল অঞ্জন মাখি
উদাসী আকাশ হাসে চাঁদের সনে।।

যাও যাও তুমি ফিরে

যাও যাও তুমি ফিরে, এই মুছিনু আঁখি
কে বাঁধিবে তোমারে, হায় বনের পাখি।

মোর এত প্রেম আশা, মোর এত ভালোবাসা
আজ সকলি দুরাশা, আর কি দিয়ে রাখি।

এই অভিমান জ্বালা, মোর একেলারি কালা
ßান মিলনেরি মালা, দাও ধুলাতে ঢাকি।

তোমার বেঁধেছিল নয়ন শুধু এ রূপের জালে
তাই দু দিন কাঁদিয়া হায় সে বাঁধন ছাড়ালে।

মোর বাঁধিয়াছে হিয়া, তায় ছাড়াব কি দিয়া
সখা হিয়া ত নয়ন নহে
সে ছাড়ে না কাঁদিয়া, দু দিন কাঁদিয়া।

আজ যে ফুল প্রভাতে হায় ফুটিল শাখাতে
তায় দেখিল না রাতে, সে ঝরিল নাকি।

হায় রে কবি প্রবাসী, নাই হেথা সুখ হাসি
ফুল ঝরে হলে বাসি, রয় কাঁটার ফাঁকি।।

সতী হারা উদাসী ভৈরব কাঁদে

সতী হারা উদাসী ভৈরব কাঁদে
বিষাণ ত্রিশূল ফেলি গভীর বিষাদে
জটাজুটে গঙ্গা নিস্তরঙ্গা
রাহু যেন গ্রাসিয়াছে ললাটের চাঁদে।

দুই করে দেবী-দেহ ধরে বুকে বাঁধে
রোদনের সুর বাজে প্রণব নিনাদে
ভক্তের চোখে আজি ভগবান শঙ্কর
সুন্দরতর হল পড়ি মায়া ফাঁদে।।

সই, ভালো করে বিনোদ-বেণী

সিন্ধু-ভৈরবী / কাহার্‌বা

সই, ভালো করে বিনোদ-বেণী বাঁধিয়া দে
মোর বঁধু যেন বাঁধা থাকে বিননী-ফাঁদে।

সই চপল পুরুষ সে, তাই কুরুশ-কাঁটায়
রাখিব খোঁপার সাথে বিঁধিয়া লো তায়
তাহে রেশমী জাল বিছায়ে দে ধরিতে চাঁদে।

বাঁধিতে সে বাঁধন হারা বনের হরিণ
জড়ায়ে দে জরীন্‌ ফিতা মোহন ছাঁদে

প্রথম প্রণয় রাগের মত আল্‌তা রঙে
রাঙায়ে দে চরণ মোর এমনি ঢঙে
সই পায়ে ধরে বঁধু যেন আমারে সাধে।।

রঙ্গীলা আপনি রাধা

রঙ্গীলা আপনি রাধা
তারে হোরীর রং দিও না
ফাগুনের রাণী যে রাই
তারে রঙে রাঙিয়ো না।

রাঙ্গা আবির রাঙ্গা ঠোঁটে
গালে ফাগের লালী ফোটে
রংসায়রে নেয়ে উঠে
অঙ্গে ঝরে রঙের সোনা।

অনুরাগ-রাঙা মনে
রঙের খেলা ক্ষণে ক্ষণে
অন্তরে যার রঙের লীলা
(তারে) বাহিরে রং লাগিয়ো না।।

শাওন আসিল ফিরে

শাওন আসিল ফিরে, সে ফিরে এল না
বরষা ফুরায়ে গেল, আশা তবু গেল না।

ধানী রং ঘাঘরীর মেঘ রং ওড়না
পরিতে আমারে মাগো অনুরোধ কোরোনা
কাজরী কাজল মেঘ পথ পেল খুঁজিয়া
সে কি ফেরার পথ পেল না মা পেল না?

আমার বিদেশীরে খুঁজিতে অনুখন
বুনোহাঁসের পাখার মতো উড়ু উড়ু করে মন

অথৈ জলে মাগো পথঘাট থৈথৈ
আমার হিয়ার আগুন নিভিল কই?
কদমকেশর বলে কোথা তোর কিশোর
চম্পাডালে ঝুলে শূন্য ঝুলনা।

মন বলে তুমি আছ ভগবান

মন বলে তুমি আছ ভগবান
চোখ বলে তুমি নাই
মিছে শুধু তোমায় ডেকে ডেকে মরি
দেখা কভু নাহি পাই।

মন বলে ঐ তৃণ-লতা-গাছে
তব সে অরূপ মিলাইয়া আছে
চোখ বলে কেন কল্পনা দিয়ে
নিজেরে নিজে ভুলাই।।

তোরা সব জয়ধ্বনি কর

তোরা সব জয়ধ্বনি কর
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়
তোরা সব জয়ধ্বনি কর

আসছে এবার অনাগত প্রলয় নেশায় নৃত্য পাগল
সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে ধমক ভেনে ভাঙলো আগল
মৃত্যুগহন অন্ধকুপে মহাকালের চন্ডরূপে ধূম্রধূপে
বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ংকর
ওরে ওই হাসছে ভয়ংকর
তোরা সব জয়ধ্বনি কর

দ্বাদশ রবির বহ্নিজ্বালা ভয়াল তাহার নয়নকটায়
দিগন্তরের কাঁদন লুটায় পিঙ্গল তার ত্রস্ত জটায়
বিন্দু তাহার নয়নজলে সপ্তমহাসিন্ধু দোলে কপোলতলে
বিশ্বমায়ের আসন তারই বিপুল বাহুর পর
হাঁকে ঐ জয় প্রলয়ংকর
তোরা সব জয়ধ্বনি কর

মাভৈঃ মাভৈঃ জগৎ জুড়ে প্রলয় এবার ঘনিয়ে আসে
জরায় মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ লুকানো ঐ বিনাশে
এবার মহানিশার শেষে আসবে Œষা অরুণ হেসে তরুণ বেশে
দিগম্বরের জটায় লুটায় শিশুচাঁদের কর
আলো তার ভরবে এবার ঘর
তোরা সব জয়ধ্বনি কর।

চুড়ির তালে নুড়ির মালা

চুড়ির তালে নুড়ির মালা রিনি ঝিনি বাজে লো
খোঁপায় দোলে বুনো ফুলের কুঁড়ি
কালো ছোঁড়ার কাঁকাল ধরে নাচে মাতাল ছুঁড়ি লো
খোঁপায় দোলে বুনো ফুলের কুঁড়ি।

মহুয়া মদের নেশা পিয়ে, বুঁদ হয়েছে বৌয়ে-ঝিয়ে
চাঁদ ছুটছে মনকে নিয়ে যেন ডুরি ছেঁড়া ঘুড়ি লো।

বাজে নুপূর পাঁইজোড়, সারা গায়ে নাচের ঘোর
ওলো লেগেছে মন হল নেশায় বিভোর
ওই আকাশে চাঁদ হের মেঘের সাথে যেন করে খুন্‌সুড়ি লো।।