যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে, অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে -

Sunday, 30 May 2010

ধূমকেতু

[ধূমকেতু]

আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!
সাত— সাতশো নরক-জ্বালা জলে মম ললাটে,
মম ধূম-কুণ্ডলী করেছে শিবের ত্রিনয়ন ঘন ঘোলাটে।
আমি অশিব তিক্ত অভিশাপ,
আমি স্রষ্টার বুকে সৃষ্টি-পাপের অনুতাপ-তাপ-হাহাকার—
আর মর্তে সাহারা-গোবি-ছাপ,
আমি অশিব তিক্ত অভিশাপ!

আমি সর্বনাশের ঝাণ্ডা উড়ায়ে বোঁও বোঁও ঘুরি শূন্যে,
আমি বিষ-ধূম-বাণ হানি একা ঘিরে ভগবান-অভিমুন্যে।
শোঁও শন-নন-নন-শন-নন-নন শাঁই শাঁই,
ঘুর্ পাক্ খাই, ধাই পাঁই পাঁই
মম পুচ্ছে জড়ায়ে সৃষ্টি;
করি উল্কা-অশনি-বৃষ্টি,—
আমি একটা বিশ্ব গ্রাসিয়াছি, পারি গ্রাসিতে এখনো ত্রিশটি।
আমি অপঘাত দুর্দৈব রে আমি সৃষ্টির অনাসৃষ্টি!

আমি আপনার বিষ-জ্বালা-মদ-পিয়া মোচড় খাইয়া খাইয়া
জোর বুঁদ হয়ে আমি চলেছি ধাইয়া ভাইয়া!
শুনি মম বিষাক্ত ‘রিরিরিরি’-নাদ
শোনায় দ্বিরেফ-গুঞ্জন সম বিশ্ব-ঘোরার প্রণব-নিনাদ!
ধূর্জটি-শিখ করাল পুচ্ছে
দশ অবতারে বেঁধে ঝ্যাঁটা করে ঘুরাই উচ্চে, ঘুরাই—
আমি অগ্নি-কেতন উড়াই!—

আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!

ঐ বামন বিধি সে আমারে ধরিতে বাড়ায়েছিল রে হাত
মম অগ্নি-দাহনে জ্বলে পুড়ে তাই ঠুঁটো সে জগন্নাথ!
আমি জানি জানি ঐ স্রষ্টার ফাঁকি, সৃষ্টির ঐ চাতুরী,
তাই বিধি ও নিয়মে লাথি মেরে, ঠুকি বিধাতার বুকে হাতুড়ি।
আমি জানি জানি ঐ ভুয়ো ঈশ্বর দিয়ে যা হয়নি হবে তাও!
তাই বিপ্লব আনি বিদ্রোহ করি, নেচে নেচে দিই গোঁফে তাও!
তোর নিযুত নরকে ফুঁ দিয়ে নিবাই, মৃত্যুর মুখে থুথু দি!
আর যে যত রাগে রে তারে তত কাল্-আগুনের কাতুকুতু দি।
মম তূরীয় লোকের তির্যক, গতি তূর্য গাজন বাজায়
মম বিষ নিশ্বাসে মারীভয় হানে অরাজক যত রাজায়!

কচি শিশু-রসনায় ধানি-লঙ্কার পোড়া ঝাল
আর বদ্ধ কারায় গন্ধক ধোঁয়া, এসিড, পটাশ, মোন্ছাল,
আর কাঁচা কলিজায় পচা ঘা’র সম সৃষ্টিরে আমি দাহ করি
আর স্রষ্টারে আমি চুষে খাই।
পেলে বাহান্ন-শও জাহান্নমেও আধা চুমুকে সে শুষে যাই!

আমি যুগে যুগে আসি আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু—
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!
আমি শি শি শি প্রলয়-শিশ্ দিয়ে ঘুরি কৃতঘ্নী ঐ বিশ্বমাতার শোকাগ্নি,
আমি ত্রিভুবন তার পোড়ায়ে মারিয়া আমিই করিব মুখাগ্নি!
তাই আমি ঘোর তিক্ত সুখে রে, একপাক ঘুরে বোঁও করে ফের দু’পাক নি!
কৃতঘ্নী আমি কৃতঘ্নী ঐ বিশ্বমাতার শোকাগ্নি!

পঞ্জর মম খর্পরে জ্বলে নিদারুণ যেই বৈশ্বানর—
শোন্ রে মর, শোন্ অমর!—
সে যে তোদের ঐ বিশ্বপিতার চিতা!
এ চিতাগ্নিতে জগদীশ্বর পুড়ে ছাই হবে, হে সৃষ্টি জানো কি তা?
কি বলো? কি বলো? ফের বলো ভাই আমি শয়তান-মিতা!
হো হো ভগবানে আমি পোড়াব বলিয়া জ্বালায়েছি বুকে চিতা!
ছোট শন শন শন ঘর ঘর ঘর সাঁই সাঁই!
ছোট পাঁই পাঁই!
তুই অভিশাপ তুই শয়তান তোর অনন্তকাল পরমাই।
ওরে ভয় নাই তোর মার নাই!!
তুই প্রলয়ঙ্কর ধূমকেতু,
তুই উগ্র ক্ষিপ্ত তেজ-মরীচিকা ন’স্ অমরার ঘুম-সেতু
তুই ভৈরব ভয় ধূমকেতু!
আমি যুগে যুগে আসি আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!

ঐ ঈশ্বর-শির উল্লঙ্ঘিতে আমি আগুনের সিঁড়ি,
আমি বসিব বলিয়া পেতেছে ভবানী ব্রহ্মার বুকে পিঁড়ি!
খ্যাপা মহেশের বিক্ষিপ্ত পিনাক, দেবরাজ-দম্ভোলি
লোকে বলে মোরে, শুনে হাসি আমি আর নাচি বব-বম্ বলি!
এই শিখায় আমার নিযুত ত্রিশূল বাশুলি বজ্র-ছড়ি
ওরে ছড়ানো রয়েছে, কত যায় গড়াগড়ি!
মহা সিংহাসনে সে কাঁপিছে বিশ্ব-সম্রাট নিরবধি,
তার ললাটে তপ্ত অভিশাপ-ছাপ এঁকে দিই আমি যদি!
তাই টিটকিরি দিয়ে হাহা হেসে উঠি,
সে হাসি গুমরি লুটায়ে পড়ে রে তুফান ঝন্ঝা সাইক্লোনে টুটি!

আমি বাজাই আকাশে তালি দিয়া ‘তাতা-উর্-তাক্’
আর সোঁও সোঁও করে প্যাঁচ দিয়ে খাই চিলে-ঘুড়ি সম ঘুরপাক!
মম নিশাস আভাসে অগ্নি-গিরির বুক ফেটে ওঠে ঘুত্কার
আর পুচ্ছে আমার কোটি নাগ-শিশু উদ্গারে বিষ-ফুত্কার!

কাল বাঘিনী যেমন ধরিয়া শিকার
তখনি রক্ত শোষে না রে তার,
দৃষ্টি-সীমায় রাখিয়া তাহারে উগ্রচণ্ড-সুখে
পুচ্ছ সাপটি খেলা করে আর শিকার মরে সে ধুঁকে!
তেমনি করিয়া ভগবানে আমি
দৃষ্টি-সীমায় রাখি দিবাযামী
ঘিরিয়া ঘিরিয়া খেলিতেছি খেলা, হাসি পিশাচের হাসি
এই অগ্নি-বাঘিনী আমি যে সর্বনাশী!

আজ রক্ত-মাতাল উল্লাসে মাতি রে—
মম পুচ্ছে ঠিকরে দশগুণ ভাতি,
রক্ত রুদ্র উল্লাসে মাতি রে!
ভগবান? সে তো হাতের শিকার!— মুখে ফেনা উঠে মরে!
ভয়ে কাঁপিছে, কখন পড়ি গিয়া তার আহত বুকের পরে!
অথবা যেন রে অসহায় এক শিশুরে ঘিরিয়া
অজগর কাল-কেউটে সে কোনো ফিরিয়া ফিরিয়া
চায়, আর ঘোরে শন্ শন্ শন্,
ভয়-বিহ্বল শিশু তার মাঝে কাঁপে রে যেমন—
তেমনি করিয়া ভগবানে ঘিরে
ধূমকেতু-কালনাগ অভিশাপ ছুটে চলেছি রে;
আর সাপে-ঘেরা অসহায় শিশু সম
বিধাতা তাদের কাঁপিছে রুদ্র ঘূর্ণির মাঝে মম!

আজিও ব্যথিত সৃষ্টির বুকে ভগবান কাঁদে ত্রাসে,
স্রষ্টার চেয়ে সৃষ্টি পাছে বা বড় হয়ে তারে গ্রাসে!

The Comet
(Original: Dhumketu)
Kazi Nazrul Islam
Translation: Kabir Chowdhury
=========================
I come in every age,
I come again and again.
Now I have come for the great revolution.
I am the creator's deadly foe,
the devastating comet of all times,
On my forehead shines the burning fire
of seven hundred hells.
I am the piteous sighs in the heart of the creator
repentant for his sinful creation.
On this earth I am the shadow of the Gobi
and the Sahara,
I am the godless, unholy, bitter curse!

FIying the banner of ruination
I whirl madly through vast empty space, f
I fight alone and strike at God
with my sharp poisoned arrow
Entwining the entire creation around my tail
I shower everywhere the flaming rains,
of a million meteors.
I have already devoured a universe
but I can devour thirty more
I am a calamity, a terrible accident,
an evil curse of the universe!

The midget fate hdd stretched his hands
to catch and curb me.
But look, the flames of my fire
have burnt his hands and turned him
into a helpless cripple.

I known that trick of creation,
I known where the creation,
And so I kick at alI rules and regulations,
and hit hard with my hammer
on God's stony breast.
I know that what the hoIlow stuffed God
could not achieve
would still be achieved!
Therefore I rebel and welcome Revolution, I
Therefore I dance and sing merrily!
I spit at the face of death
and blow out the burning fires
of a thousand hells.

The more people fume and rage
the more I laugh and make fun of them,
I move like a hurrican
and my poisoned breath drives a mortal terror
into the heart of all tyrannous kings,
I burn the whole creation
with the flames of my fire
I crunch God into tiny pieces and swallow at a gulp
a million hells.

Filled with a bitter happiness
I dance and sing like one gone mad.
I build a burning fire in my bosom
that I can roast God in its flames.
I come in every age.
It is time I have come for the great revolution.
I am the creator's deadly foe,
the devastating comet of all times! A

I burn a flaming ladder of fire,
I effortlessly sail over God's head
The god of the universe sitting in his throne
trembles in fear lest I brand on his
pale forehead the sign of my terrible curse.

Oh, how he makes me laugh
and how the sound of my ringing laughter
merges with the song of thunder and raging cyclone

Clapping my hands in ecstasy
I go whirling through empty space
like some crazy kite,
At the faintest touch of my breath
volcanoes erupt with a roar
and a million baby-snakes, coiled around my tail,
hiss and lay bare their poisonous fangs!

As the fierce tigress refrains from killing its prey
with a single blow
and keeping it steadily in sight
plays with it with a gleaming cruel joy
while the poor prey pants and whines
So do I keep God within the range
of my sight and play with him,
laughing all the time my blood-curling
demoniac laughter.

I am that fiery tigress,
the greatest calamity of all time!
Drunk with blood I celebrate and rejoice today,
From my tail emanates a dazzling radiance,
filling the earth with a fierce, butal joy,

God?
There lies he, a poor captive,
foaming at the lips in fear and frustration.
He trembles and cowers
afraid of the moment when I shall rush
and jump on his wounded breast
Or, like an angry black cobra
whirling round a helpless frightened child

I, a fierce Comet-cobra, the bitterest curse of all time,
whirl round God as he sits there
trembling in fear like that snake-encircled helpless child.

Today sitting in the midst of a sad and
suffering creation
God trembles in fear
lest the created, growing bigger than the
creator, swallows him at last

Courtesy: Mohammad Nurul Huda. Poetry of Kazi Nazrul Islam in English Translation [Dhaka: Nazrul Institute, 2000). pp. 36-38.

প্রলয়োল্লাস

তোরা সব জয়ধ্বনী কর!
তোরা সব জয়ধ্বনী কর!
ঐ নতুনের কেতন ওরে কাল- বোশেখীর ঝড়।
তোরা সব জয়ধ্বনী কর!
তোরা সব জয়ধ্বনী কর!

আসছে এবার অনাগত প্রলয়- নেশার নৃত্য পাগল
সিন্ধুপারের সিংহ- দ্বারে ধমক হেনে ভাংল আগল।
মৃত্যু- গহন অন্ধ-কুপে
মহাকালের চন্ড- রূপে-
ধুম-ধুপে
বজ্র-শিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ংকর-
ওরে ঐ হাসছে ভয়ংকর।
তোরা সব জয়ধ্বনী কর!
তোরা সব জয়ধ্বনী কর!


ঝামর তাহার কেশের দোলায় ঝাপটা মেরে গগন দুলায়,
সর্বনাশা জ্বালা- মুখী ধুমকেতু তার চামর ঢুলায়।
বিশ্বপাতার বক্ষ-কোলে
রক্ত তাহার কৃপাণ ঝোলে
দোদুল দোলে
অট্ট্রোলের হট্টগোলে স্তব্ধ চরাচর-
ওরে ঐ স্তব্ধ চরাচর।
তোরা সব জয়ধ্বনী কর!
তোরা সব জয়ধ্বনী কর!

দ্বাদশ রবির বহ্নি-জ্বালা ভয়াল তাহার নয়ন- কটায়,
দিগন্তরের কাঁদন লুটায় পিঞ্জল তার ত্রস্ত জটায়।
বিন্দু তাহার নয়ন জলে
সপ্ত মহাসিন্ধু দলে
কপোল-তলে।
বিশ্ব-মায়ের আসন তারি বিপুল বাহুর' পর-
হাঁকে ঐ ''জয় প্রলয়ংকর!"
তোরা সব জয়ধ্বনী কর!
তোরা সব জয়ধ্বনী কর!


মাভৈঃ, মাভৈঃ! জগৎ জুড়ে প্রলয় এবার ঘনিয়ে আসে।
জরায় মরা মুমুর্ষদের প্রান-লুকানো ঐ বিনাশে।
এবার মহা নিশার শেষে
আসবে উষা অরুণ হেসে
করুণ বেশে।
দিগম্বরের জটায় লুটায় শিশু চাঁদের কর,
আলো তার ভরবে এবার ঘর!
তোরা সব জয়ধ্বনী কর!
তোরা সব জয়ধ্বনী কর!


ঐ সে মহাকাল সারথি রক্ত- তড়িৎ চাবুক হানে,
রণিয়ে ওঠে হ্রেষার কাঁদন বজ্র- গানে ঝড় তুফানে।
ক্ষুরের দাপট তারায় লেগে উল্কা ছুটায় নীল খিলানে।
গগন-তলের নীল খিলানে।
অন্ধ কারার বন্ধ কুপে
দেবতা বাঁধা যজ্ঞ-যুপে
পাষান- স্তুপে!
এইতো রে তার আসার সময় ঐ রথ- ঘর্ঘর-
শোনা যায় ঐ রথ ঘর্ঘর!
তোরা সব জয়ধ্বনী কর!
তোরা সব জয়ধ্বনী কর!


ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর?- প্রলয় নতুন সৃজন- বেদন।
আসছে নবীন- জীবন- হারা অসুন্দরে করতে ছেদন।
প্রলয় বয়েও আসছে হেসে-
মধুর হেসে।
ভেঙ্গে আবার গড়তে জানে সে চির- সুন্দর।
তোরা সব জয়ধ্বনী কর!
তোরা সব জয়ধ্বনী কর!


ঐ ভাঙ্গা- গড়া খেলা যে তার কিসের আবার ডর?
তোরা সব জয়ধ্বনী কর!
বধুরা প্রদীপ তুলে ধর!
কাল ভয়ংকরের বেশে এবার ঐ আসে সুন্দর।
তোরা সব জয়ধ্বনী কর!
তোরা সব জয়ধ্বনী কর!


The Ecstasy of Destruction
(Original: Proloyollash)
Kazi Nazrul Islam
Translation: Kabir Chowdhury

Come, make merry and rejoice.
There rages the summer storm
flying the flag of the New and the Young,

There comes he who had not come so long;
Dancing merrily
drink we will the joy of destruction.
There comes the Terrible
like the fierce executioner of eternal time
across the dark well of death
through smouldering smoke
lighting the torch of thunder.
There, listen to his ringing laughter.
Come, make merry and rejoice!

The wavy locks of his hair
make the sky rock and swing.
Even the ominous comet is at his service.
His blood, like an unsheathed sword,
rocks the bosom of the father of the universe.
Look, this wild tumultuous tunnoil
has made the sky and the earth still and numb
Come, make merry and rejoice.

A dozen suns glitter and shine in his burning eyes
And the sorrows of the world cluster in his
tangled and disheveled hair.
A single drop of his tear
makes the seven seas roll and swell.
In his giant arms he crakles the mother-earth
and cries out, "Welcome, Destruction!"
Come, comrades, make merry and rejoice, '

Oh, have no fear!
The deluge will soon overtake the universe.
The final hour is fast drawing near.
The rotting old and the dying decrepit
will now be wiped out for good.
Now at last at the end of the long night of darkness
The glorious dawn will come with a smile
in her soft and tender dress.
Look, there the young moon shines in his unkempt hair.

Its light will fill your room
and make it glow with a strange radiance,
Come, make merry and rejoice!
There he comes flashing his whip of blood and lightning,
directing the passage of eternity.
The neighing of his horse reverberates in the stormy wind
and in the song of thunder.
The blast of his hoofs hits the stars
and scatters them shooting
through the columns of the blue-domed sky.
The gods are all lying in the dead well
of a dark dungeon.

They are tied to the cold stony pillar
of the sacriticial altar.
Indeed this is the time for him
to come triumphantly riding his gorgeous chariot.
O comrades, come, make merry and rejoice!
Why should the sight of destruction frighten you?
All this upheaval is but the birth pain
of a new creation.
There comes the bold new youth
eager to wipe out all that is ugly and decayed.
He comes with' his unkempt hair and careless dress
on the wings of the Deluge
with a smile on his lips.
He is the eternal beauty
who knows how to destroy and build again,

Come, make merry and rejoice!
What fear has
for whom all this destruction and rebuilding
is but a game?
Come, make merry and rejoice,
and welcome the Beautiful
who comes today in the garb of the Terrible.

Courtesy: Mohammad Nurul Huda. Poetry of Kazi Nazrul Islam in English Translation [Dhaka: Nazrul Institute, 2000). pp. 4-6.

At My Gaze No Longer Laughs the Rose

At My Gaze No Longer Laughs the Rose
Kazi Nazrul Islam
Translation: Kabir Chowdhury
=========================
At my gaze no longer laughs the rose,
At the music of my words no longer blossoms forth the flowers


What is the use of going to the fair
With the garland of the withered smile ?
Dose the dark night amaze her disheveled hair
Without looking at the moon for a while ?


The southern wind brings the springs yet
But in the garden the nightingale sings no more.
No more does the wild flower in the forest
Dance at the sight of the moon


Something is lost, something is missing,
My heart feels so empty and old.
Ah me, at whose cruel touch
Has my heart grown so cold!

গরবিনী মুসলিম বালা

গরবিনী মুসলিম বালা

আমি গরবিনী মুসলিম বালা!
সংসারে সাহারাতে আমি গুলে লালা!!

জ্বালায়েছি বাতি আঁধার কাবায়,
এনেছি খুশীর ঈদে শিরনির থালা।।

আনিয়াছি ঈমান প্রথম আমি,
আমি দিয়াছি সবার আহে মোহাম্মদকে মালা।।
কত শত কারবালা বদরের রণে
বিলায়ে দিয়াছি স্বামী- পুত্র স্বজনে,
জানে গ্রহ- তারা জানে আল্লাহতালা।।

নজরুল রচনাবলী/ খন্ড-৪/ পৃষ্ঠা-৪৭৭
কাজী নজরুল ইসলাম | লিখেছেন - আবদুল মান্নান সৈয়দ | ২৫ মে ২০০৯ ১:২৬ অপরাহ্ন

সাকি,
কোথায় তোমার চিঠি? এদিকে তোমার বান্ধবীর চিঠির তোড়ে আমি তো প্রায় ভেসেই যাচ্ছি। রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লেখায় না-হারিয়ে ছাড়বে না মনে হচ্ছে। আমিও ছাড়বার পাত্র নই। তুমি জানো কিনা জানি না, রবীন্দ্রনাথ এন্ডরুজ সাহেবকে একবার সাহেব মহোদয় বিদেশ থেকে ফিরলে একতাড়া চিঠি তাঁর হাতে অর্পণ করেন। আমিও সেই আদর্শে তোমার উদ্দেশে এই চিঠি লেখা শুরু করলাম। রবীন্দ্রনাথের মতো অবসর নেই তো আমার—ফলে একগোছা পত্র রচনা করতে একটু সময় নেবে হয়তো। কিন্তু রবীন্দ্রাদর্শ ভুলছি না। বলতে পারো, এই চিঠি তার শুভসূচনা।

আজকে তোমার সঙ্গে নজরুল নিয়ে একটু গল্প করি।—নজরুলের সঙ্গে অগ্রজ শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ আর পরবর্তী শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দের সম্পর্কের দ্বন্দ্বসমাস। ওটা অনিবার্য। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের কালে আমি থাকলে নিশ্চিতভাবে তাঁদের সঙ্গে আমার ভালো-মন্দ সম্পর্কের একটা গাঁটছড়া পড়তই। আমার আকঙ্ক্ষক্ষা নীরবতা। কিন্তু আমার বিধিলিপি একেবারে উল্টোটা।

থাকগে, মূল প্রসঙ্গে আসি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) থেকে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯ - স্তব্ধতা ১৯৪২ - ১৯৭৬) আর জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) বয়সে বছর চল্লিশের ছোট। রবীন্দ্রনাথের বড় ছেলে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরও নজরুল এবং জীবনানন্দের চেয়ে বছর দশেকের ছোট।

বিশের ও ত্রিশের দশকে এই তিন কবিই একসঙ্গে কাজ করেছেন। সেদিক থেকে বয়েসের দুস্তর ফারাকে কোনো আসে যায় না। একদিক থেকে তাঁরা তিনজনই সমসাময়িক। দূরবর্তিতাও একেবারে বিস্মৃত হয়ো না। রবীন্দ্রনাথের প্রথম কবিতাগ্রন্থ কবিকাহিনী বেরিয়েছিল ১৮৭৮ সালে; নজরুলের প্রথম কবিতাগ্রন্থ অগ্নিবীণা প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে; আর জীবনানন্দের প্রথম কবিতাগ্রন্থ ঝরা পালক ১৯২৭ সালে।

কবিকাহিনী-র সঙ্গে তিলমাত্র মিল নেই অগ্নিবীণা-র। এমনকি যে-রবীন্দ্রনাথ তাঁর কালে ব্যপকতম প্রভাব বিস্তার করেছিলেন অগ্নিবীণা তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। অগ্নিবীণা নামটি কিন্তু রবীন্দ্রনাথ থেকেই গৃহীত। নজরুল ‘রবীন্দ্রসংগীতের হাফেজ’ ছিলেন, কিন্তু নজরুলসংগীতও রবীন্দ্রসংগীত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তবে রবীন্দ্রপ্রভাব নজরুলের অনেক ক্ষেত্র থেকেই দেখানো যেতে পারে। মনে পড়ছে, ১৯৭০ সালে রবীন্দ্রসংগীতকে ওয়াহিদুল হক একবার তাঁর বাসভবনে এমন-কিছু নজরুলসংগীত শুনিয়েছিলেন আমাদের, যা রবীন্দ্রসংগীতের আদলে তৈরি। কিন্তু তাতে কোনো আসে যায় না: সামগ্রিক নজরুল ইসলাম সামগ্রিক রবীন্দ্রনাথ থেকে একেবারেই বিভিন্ন।

দ্যাখো না, রবীন্দ্রনাথের মাত্র বছর চল্লিশেক বয়সে তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর বিয়োগবেদনা সহ্য করতে হলো তাঁকে; রবীন্দ্রনাথ স্মরণ নামে একটি কবিতাগ্রন্থ লিখলেন, সম্ভবত কয়েকটি গানও। কাছাকাছি বয়েসে তাঁকে পুত্রকন্যার অকালমৃত্যুতে অপরিসীম শোকও সহ্য করতে হলো; কনিষ্ঠ পুত্র শমী-র (শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর) মৃত্যু তাঁকে বিচলিত করল বটে, কিন্তু সেও অসম্ভব মনোবলে সামলে নিলেন যেন। আর নজরুলেরও ওই বছর চল্লিশেক বয়েসে স্ত্রী প্রমীলা কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়াতেই যেন তাঁর অসুখ সারানোর জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠলেন, এমনকি নিজে অসুস্থ হয়ে গেলেন। পুত্র বুলবুলের একেবারে অকালমৃত্যুতে নজরুল সম্পূর্ণ মুষড়ে পড়েছিলেন—তাঁর গান মরমীলোকে প্রবেশ করেছিল। এদিকে জীবনানন্দের এরকম প্রিয়জনের শোকবেদনা সহ্য করতে হয়নি।

আর দ্যাখো, নজরুল প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন—তাও ভিন্ন ধর্মে। অন্যপক্ষে, রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের স্ত্রী ছিলেন তাঁদের পারিবারিক ব্যবস্থাপনায় নির্বাচিত। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী বিয়োগের পর তিনি স্মরণ কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছিলেন; তারপর তাঁর রচনা ও কর্মপ্রবাহে তিলমাত্র যতি পড়েনি। নজরুলের স্ত্রী অশুস্থ হওয়ার পর তিনি তাঁকে সুস্থ করে তোলবার সম্ভব-অসম্ভব সবরকম চেষ্টা করেছেন, প্রমীলার আগেই তিনি অসুস্থ ও জমকা নির্বাক হয়ে যান, তাঁর স্তব্ধতার মধ্যেই তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যু ঘটে, তিনি বুঝতেও পারেন না কিছু, তারপরও দীর্ঘকাল বেঁচে থাকেন। মৃণালিনী ও প্রমীলা ছিলেন পতিব্রতা। লাবণ্য দাশের অনেক অভিযোগ ছিল জীবনানন্দের প্রতি। সরাসরি বলব: রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল সংসারজীবনে ছিলেন সুখী, জীবনানন্দ তা ছিলেন না।

আরএক দিকেও জীবনানন্দ ছিলেন হতভাগ্য: রবীন্দনাথ ও নজরুলকে বাস্তুচ্যুতির বেদনা বহন করতে হয়নি। দেশভাগের ফলে, দেশভাগের আগেই, ১৯৪৬ সালে, তাঁর প্রিয় বরিশাল ছেড়ে চিরকালের মতো তাঁকে চলে যেতে হয়েছিল কলকাতায়—এবং যে-কয়েক বছর বেঁচে ছিলেন ঠিক নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি। আরেকদিক থেকেও এই মহাকবি বঞ্চিত ছিলেন—রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল দেশবাসীর কাছে যে- সম্মাননা পেয়েছিলেন জীবনানন্দ তার কণামাত্র পাননি তার জীবৎকালে।

নজরুলকে কেন্দ্রে রেখে অগ্রসর হওয়া যাক।

১৯১৯ সালে সাহিত্যে প্রবেশ করেছিলেন সমবয়সী দুই কবি—নজরুল ও জীবনানন্দ। দুজনেরই—তদানীন্তন প্রায়-সকলেরই কর্মক্ষেত্র থেকে—এঁদেরও—কিন্তু ১৯১৯ সালে দুই স্থান থেকে: নজরুল করাচি থেকে লেখা পাঠিয়ে ছিলেন কলকাতার সওগাত পত্রিকায় আর জীবনানন্দের কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল বরিশাল থেকে প্রকাশিত ব্রহ্মবাদী পত্রিকায়। সওগাত ছিল অনগ্রসর মুসলমান সমাজের পত্রিকা, ব্রহ্মবাদী ছিল একটেরে ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র—জীবনানন্দের পিতা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন যার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক। কিন্তু শেষপর্যন্ত নজরুল ও জীবনানন্দ মুসলমান বা ব্রাহ্মসমাজে আটকা থাকেননি—বৃহত্তর বাঙালির হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে স্নেহ করতেন, সস্নেহে ‘তুই-তোকরি’ করতেন, নজরুলকে সাবধানও করেছেন, যে-সাবধানবাণী নজরুল শোনেননি, নজরুল যখন জেলে তখন তাঁকে বই উৎসর্গ করেছেন, নজরুলের দুটি পত্রিকাতেই—ধুমকেতু আর লাঙলে—কবিতায় আশির্বাণী পাঠিয়েছেন। অন্যপক্ষে নজরুল রবীন্দ্রনাথকে তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতাসংগ্রহ সঞ্চিতা উৎসর্গ করেছেন, রবীন্দ্রনাথের জীবৎকালে কবিতা ও গদ্য লিখেছেন তাঁকে নিয়ে, ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণের পর কবিতা লিখেছেন ও আবৃত্তি করেছেন, গান লিখেছেন ও সুর করেছেন ও গেয়েছেন।

তবে একটি শব্দ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের বাহাস্ হয়েছিল: রবীন্দ্রনাথ তাঁর মন্তব্য থেকে সরে যাননি, নজরুলও তাঁর বক্তব্যে স্থিরদৃঢ় ছিলেন। শব্দটি ‘খুন্’—রক্ত অর্থে। ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ারে’ শব্দটি আছে—‘উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পুনর্বার।’ কবিতাটি ১৯২৬ সালে কলকাতায় হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গার পটভূমিতে রচিত। রবীন্দ্রনাথ একটি ভাষণে শব্দটি ব্যবহারের বিরুদ্ধে বলেছিলেন, এবং তাঁর জীবনের শেষ বছর পর্যন্ত শব্দটি স্বীকার করে নিতে পারেননি—সাক্ষ্য তাঁর চিঠিপত্র। অন্যপক্ষে, নজরুল রবীন্দ্রনাথের ভাষণের মন্তব্যের বিরুদ্ধে এক ক্রোধী-কিন্তু-উন্মোচক প্রবন্ধ লিখেছিলেন ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’। আবার, এই প্রবন্ধটি ছিল একক-কিছু নয়—রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আধুনিক তথা ‘অতিআধুনিক’ লেখকদের যে-বিরুদ্ধতা হয়েছিল—যার অগণন সাক্ষ্য আছে সেকালের পত্র-পত্রিকায়—তারই অন্যতম। শরৎচন্দ্র থেকে বুদ্ধদেব বসু (যাঁরা আবার ছিলেন পরস্পরের বিরুদ্ধে) সকলেই রবীন্দ্রনাথের বিপক্ষ দলের লেখক ছিলেন। এঁরা সবাই—নজরুল সমেত—রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, কিন্তু তাঁদের শ্রদ্ধা অকণ্টক ছিল না পূর্বজ ও সমসাময়িক অধিকাংশের মতো।

আবার, একটা বিষয় লক্ষ্য করো: রবীন্দ্রনাথ নজরুলের প্রতি যেটুকু স্নেহপরায়ণ ছিলেন, জীবনানন্দের প্রতি তার একটুও নয়। জীবনানন্দের প্রতি রবীন্দনাথ প্রায় ভর্ৎসনা করেছেন তাঁর কবিতার মুদ্রাদোষের জন্যে—সেই রবীন্দ্রনাথ, যিনি প্রায় সবাইকে প্রশংসা বিতরণে অকৃপণ ছিলেন—সম্ভবত চিঠিটি জীবনানন্দের প্রথম কবিতাগ্রন্থ ঝরা পালক পাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ পাঠিয়েছিলেন। জীবনানন্দের দ্বিতীয় কবিতাগ্রন্থ ধুসর পাণ্ডুলিপি ও সমালোচনার জন্যে তাঁর কাতর প্রার্থনার উত্তরে রবীন্দ্রনাথ দুই ছত্রের একটি পত্র প্রেরণ করেছিলেন।

একই কালের জাতক দুই কবি নজরুল ও জীবনানন্দের পরস্পরের প্রতি কী ধারণা ছিল শুনবে?

জীবনানন্দের প্রথম কবিতাগ্রন্থে এবং প্রাথমিক কবিতাগুচ্ছে নজরুলের স্পষ্ট প্রভাব ছিল। পরে জীবনানন্দের কবিতা আমূল বদলে যায়। নজরুলের অকাল অসুস্থতার (১৯৪২) পরে জীবনানন্দ দুটি প্রবন্ধ লিখে ছিলেন—যেখানে সমালোচনা ছিল, প্রশস্তিও ছিল। আধুনিক সাহিত্যের এক প্রধান সাময়িকপত্র কালিকলম অফিসে জীবনানন্দ নজরুলকে প্রথম দেখেছিলেন, একটি চিঠিতে জীবনানন্দ তা উল্লেখ করেছেন। জানো, সওগাত-সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন আমাকে জানিয়েছিলেন, জীবনানন্দ মাঝে মাঝে সওগাত অফিসে যেতেন, সেখানেও নজরুলের সঙ্গে দেখা হতে পারে তাঁর। খানিকটা আশ্চর্য হয়েই দেখেছি কমরেড মুজফ্ফর আহমদ সম্পাদিত গণবাণী পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতেই জীবনানন্দের একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। সেদিক থেকে গণবাণী অফিসেও নজরুলের সঙ্গে দেখা হতে পারে। কথাবার্তা হয়েছে কিনা জানি না। অগ্রজ কবি কালিদাস রায়-যতীন্দ্র মোহন বাগচীকেও যখন নজরুল ঝরা পালক পাঠিয়েছিলেন, তখন নজরুলকেও পাঠাবেন স্বাভাবিক, কিন্তু নজরুল-পরিবার প্রায় কিছুই রক্ষা করেননি—এত বড় দুর্ভাগ্য রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দ কারোরই কিন্তু হয়নি।

রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ তিনজনই প্রবাসী, কল্লোল—এরকম সেকালীন পত্রিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। জীবনানন্দ, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ তিনজনই সেকালের আধুনিকতার অল্পপরিচিত একটি বাহক ধূপছায়া-য় অবতীর্ণ হয়েছিলেন, একই সংখ্যায় এঁদের লেখা দেখেছি বলে মনে হচ্ছে, তা না হলেও একই বর্ষে বটেই। নজরুল আর জীবনানন্দ ওই পত্রিকায় ছিলেন আধুনিকতার প্রতিভূ, আর ওই পত্রিকাতেই যদ্দুর মনে পড়ছে ‘স্পর্ধা’ নামে একটি কবিতায় রবীন্দ্রনাথ আধুনিকতার উদ্দেশে তির্যক বাণ নিক্ষেপ করেছিলেন।

আমরা এখন, সাকি, ওঁদের শতাব্দী পার হয়ে এসেছি। বিংশ শতাব্দী। শতাব্দীপার থেকে দেখছি তিন মহাকবিকে—এঁদের একজন সম্পূর্ণ আত্মবৃত, জীবনানন্দ; একজন পুরো-খোলা, নজরুল; অন্যজন নির্জন না সামাজিক নাকি দুইই তা আজো আমি বুঝে উঠতে পারলাম না—রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথের সংস্পর্শিত নারীদের নাম আমরা জানি—কাদম্বরী দেবী, ইন্দিরা দেবীচৌধুরানী, রানু (লেডি রানু মুখার্জি), ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো প্রমুখ; নজরুলের নারীরাও অচেনা নয় আমাদের—রানু সোম, উষা মৈত্র, মিস ফজিলতুন্নেসা, জাহানারা বেগম চৌধুরী প্রমুখ; এতকাল পরে জীবনানন্দের ডায়েরিতে উন্মুক্ত হলো তাঁর জীবনে অন্তত একটি মোহিনীর আবির্ভাব। এঁরা সব কোথায়?—কিন্তু এঁরা সব জাগ্রত আছেন রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দের কবিতায়-গানে। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ ওঁরাও তো মিশে গেছেন পঞ্চভূতে, কিন্তু রয়ে গেছে ওঁদের অক্ষর-শব্দ-বাক্য।

এই যে অক্ষর-শব্দ-বাক্য বসিয়ে, তোমার উদ্দেশে এই চিঠি বাতাসে ভাসিয়ে দিলাম, এই বুনোহাঁসটিকে—দ্যাখো তো—তোমার নীড়ে বাঁধতে পারো কিনা।

১০ই জ্যৈষ্ঠ ১৪১৬

SOURCE: bdnews24.com

Saturday, 29 May 2010

অ-কেজোর গান

ঐ ঘাসের ফুলে মটরশুটির ক্ষেতে
আমার এ-মন-মৌমাছি ভাই উঠেছে আজ মেতে।।

এই রোদ-সোহাগী পউষ-প্রাতে
অথির প্রজাপতির সাথে
বেড়াই কুঁড়ির পাতে পাতে
পুষ্পল মৌ খেতে।
আমি আমন ধানের বিদায়-কাঁদন শুনি মাঠে রেতে।।

আজ কাশ-বনে কে শ্বাস ফেলে যায় মরা নদীর কূলে,
ও তার হলদে আঁচল চ’লতে জড়ায় অড়হরের ফুলে!
ঐ বাবলা ফুলের নাকছবি তার,
গা’য় শাড়ি নীল অপরাজিতার,
চ’লেছি সেই অজানিতার
উদাস পরশ পেতে।।

আমায় ডেকেছে সে চোখ-ইশারায় পথে যেতে যেতে।।
ঐ ঘাসের ফুলে মটরশুটির ক্ষেতে
আমার এ-মন-মৌমাছি ভাই উঠেছে তাই মেতে।।

Song of the Do-Nothing
Translation: Abdul Hakim


My mind as the Bee today runs a-field
amid the blossoms of the grass in
the field of mator-shuti --
On this winter morn enamored of the
sun-light.

I like to accompany the restless butterfly
From bud to bud
In the field of flowery Maw plants.
And at night I hear the farewell wails
of Amman paddy in the meadow
Who's today taking a round amid
Kusha grasses along the bank of the dead river?
Lo! her yellow skirt gets entangled
among aroher flowers
She wears t hat Babla flower as her
nose-top.
And around her body is her cloth
of green Aparajita.
I am keen for a touch of that fair unknown!

She send me while walking
speechless message of her eyes.
And so my mind as the Bee runs
in wild ecstasy amid the blossoms
of the grass in the field of Mator-Shuti.

আপন-পিয়াসী

আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন
খুঁজি তারে আমি আপনার,
আমি শুনি যেন তার চরণের ধ্বনি
আমারি তিয়াসী বাসনায়।।

আমারই মনের তৃষিত আকাশে
কাঁদে সে চাতক আকুল পিয়াসে,
কভু সে চকোর সুধা-চোর আসে
নিশীথে স্বপনে জোছনায়।।

আমার মনের পিয়াল তমালে হেরি তারে স্নেহ-মেঘ-শ্যাম,
অশনি-আলোকে হেরি তারে থির-বিজুলি-উজল অভিরাম।।
আমারই রচিত কাননে বসিয়া
পরানু পিয়ারে মালিকা রচিয়া,
সে মালা সহসা দেখিনু জাগিয়া,
আপনারি গলে দোলে হায়।।

Enamoured of Self
Translation: Kabir Chowdhury

I look for her
Who is closer to me than my own self.
I seem to hear her footsteps
In my burning desire.

Like the skylark, in unquenched thirst,
She pines for water in the parched
Sky of my mind
Like the chakor she steals into my dream
In soft, moon-lit night.

In the green foliage of my mind
I see her as the dark benevolent cloud..
In the sharp lightning-flash I find
Her as thunders roar aloud.

I sit in the bower I made
And garland my beloved;
But suddenly with a start I wake
And find it, alas, around my own neck.