যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে, অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে -

Friday, 28 May 2010

পূজারিণী

এত দিনে অবেলায়-
প্রিয়তম!
ধূলি-অন্ধ ঘূর্ণি সম
দিবাযামী
যবে আমি
নেচে ফিরি র”ধিরাক্ত মরণ-খেলায়-
এ দিনে অ-বেলায়
জানিলাম, আমি তোমা’ জন্মে জন্মে চিনি।
পূজারিণী!
ঐ কন্ঠ, ও-কপোত- কাঁদানো রাগিণী,
ঐ আখি, ঐ মুখ,
ঐ ভুর”, ললাট, চিবুক,
ঐ তব অপরূপ রূপ,
ঐ তব দোলো-দোলো গতি-নৃত্য দুষ্ট দুল রাজহংসী জিনি’-
চিনি সব চিনি।

তাই আমি এতদিনে
জীবনের আশাহত ক্লান- শুষ্ক বিদগ্ধ পুলিনে
মূর্ছাতুর সারা প্রাণ ভ’রে
ডাকি শুকু ডাকি তোমা’
প্রিয়তমা!
ইষ্ট মম জপ-মালা ঐ তব সব চেয়ে মিষ্ট নাম ধ’রে!
তারি সাথে কাঁদি আমি-
ছিন্ন-কন্ঠে কাঁদি আমি, চিনি তোমা’, চিনি চিনি চিনি,
বিজয়িনী নহ তুমি-নহ ভিখারিনী,
তুমি দেবী চির-শুদ্ধ তাপস-কুমারী, তুমি মম চির-পূজারিণী!
যুগে যুগে এ পাষাণে বাসিয়াছ ভালো,
আপনারে দাহ করি, মোর বুকে জ্বালায়েছ আলো,
বারে বারে করিয়াছ তব পূজা-ঋণী।
চিনি প্রিয়া চিনি তোমা’ জন্মে জন্মে চিনি চিনি চিনি!
চিনি তোমা’ বারে বারে জীবনের অস–ঘাটে, মরণ-বেলায়,
তারপর চেনা-শেষে
তুমি-হারা পরদেশে
ফেলে যাও একা শুণ্য বিদায়-ভেলায়!

দিনানে-র প্রানে- বসি’ আঁখি-নীরে তিনি’
আপনার মনে আনি তারি দূর-দূরানে-র স্মৃতি-
মনে পড়ে-বসনে-র শেষ-আশা-ম্লান মৌন মোর আগমনী সেই নিশি,
যেদিন আমার আঁখি ধন্য হ’ল তব আখি-চাওয়া সনে মিশি।
তখনো সরল সুখী আমি- ফোটেনি যৌবন মম,
উন্মুখ বেদনা-মুখী আসি আমি ঊষা-সম
আধ-ঘুমে আধ-জেগে তখনো কৈশোর,
জীবনের ফোটো-ফোটো রাঙা নিশি-ভোর,
বাধা বন্ধ-হারা
অহেতুক নেচে-চলা ঘূর্ণিবায়ু-পারা
দুরন- গানের বেগ অফুরন- হাসি
নিয়ে এনু পথ-ভোলা আমি অতি দূর পরবাসী।
সাথে তারি
এনেছিনু গৃহ-হারা বেদনার আঁখি-ভরা বারি।
এসে রাতে-ভোরে জেগে গেয়েছিনু জাগরণী সুর-
ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছিলে তুমি কাছে এসেছিলে,
মুখ-পানে চেয়ে মোর সকর”ণ হাসি হেসেছিলে,-
হাসি হেরে কেঁদেছিনু-‘তুমি কার পোষাপাখী কান-ার বিধুর?’
চোখে তব সে কী চাওয়া! মনে হ’ল যেন
তুমি মোর ঐ কন্ঠ ঐ সুর-
বিরহের কান্না-ভারাতুর
বনানী-দুলানো,
দখিনা সমীরে ডাকা কুসুম-ফোটানো বন-হরিণী-ভুলানো
আদি জন্মদিন হ’তে চেন তুমি চেন!
তারপর-অনাদরে বিদায়ের অভিমান-রাঙা
অশ্র”-ভাঙা-ভাঙা
ব্যথা-গীত গেয়েছিনু সেই আধ-রাতে,
বুঝি নাই আমি সেই গান-গাওয়া ছলে
কারে পেতে চেয়েছিনু চিরশূন্য মম হিয়া-তলে-
শুধু জানি, কাঁচা-ঘুমে জাগা তব রাগ-অর”ণ-আঁখি-ছায়া
লেগেছিল মম আঁখি-পাতে।
আরো দেখেছিনু, ঐ আঁখির পলকে
বিস্ময়-পুলক-দীপ্তি ঝলকে ঝলকে
ঝ’লেছিল, গ’লেছিল গাঢ় ঘন বেদানার মায়া,-
কর”ণায় কেঁপে কেঁপে উঠেছিল বিরহিণী
অন্ধকার-নিশীথিনী-কায়া।

তৃষাতুর চোখে মোর বড় যেন লেগেছিল ভালো
পূজারিণী! আঁখি-দীপ-জ্বালা তব সেই সিগ্ধ সকর”ণ আলো।

তারপর-গান গাওয়া শেষে
নাম ধ’রে কাছে বুঝি ডেকেছিনু হেসে।
অমনি কী গ’র্জে-উঠা র”দ্ধ অভিমানে
(কেন কে সে জানে)
দুলি’ উঠেছিল তব ভুর”-বাঁধা সি’র আঁখি-তরী,
ফুলে উঠেছিল জল, ব্যথা-উৎস-মুখে তাহা ঝরঝর
প’ড়েছিল ঝরি’!
একটু আদরে এত অভিমানে ফুলে-ওঠা, এত আঁখি-জল,
কোথা পেলি ওরে কা’র অনাদৃতা ওরে মোর ভিখারিনী
বল্‌ মোরে বল্‌ ।
এই ভাঙা বুকে
ঐ কান্না-রাঙা মুখ থুয়ে লাজ-সুখে
বল্‌ মোরে বল্‌-
মোরে হেরি’ কেন এত অভিমান?
মোর ডাকে কেন এত উথলায় চোখে তব জল?
অ-চেনা অ-জানা আমি পথের পথিক
মোরে হেরে জলে পুরে ওঠে কেন এত ঐ বালিকার আঁখি অনিমিখ?
মোর পানে চেয়ে সবে হাসে,
বাঁধা-নীড় পুড়ে যায় অভিশপ্ত তপ্ত মোর শ্বাসে;
মণি ভেবে কত জনে তুলে পরে গলে,
মণি যবে ফণী হয়ে বিষ-দগ্ধ-মুখে
দংশে তার বুকে,
অমনি সে দলে পদতলে!
বিশ্ব যারে করে ভয় ঘৃণা অবহেলা,
ভিখরিণী! তারে নিয়ে এ কি তব অকর”ণ খেলা?
তারে নিয়ে এ কি গূঢ় অভিমান? কোন্‌ অধিকারে
নাম ধ’রে ডাকটুকু তা’ও হানে বেদনা তোমারে?
কেউ ভালোবাসে নাই? কেই তোমা’ করেনি আদর?
জন্ম-ভিখারিনী তুমি? তাই এত চোখে জল, অভিমানী কর”ণা-কাতর!
নহে তা’ও নহে-
বুকে থেকে রিক্ত-কন্ঠে কোন্‌ রিক্ত অভিমানী কহে-
‘নহে তা’ও নহে।’
দেখিয়াছি শতজন আসে এই ঘরে,
কতজন না চাহিতে এসে বুকে করে,
তবু তব চোখে-মুখে এ অতৃপ্তি, এ কী স্নেহ-ক্ষুধা
মোরে হেলে উছলায় কেন তব বুক-ছাপা এত প্রীতি সুধা?
সে রহস্য রাণী!
কেহ নাহি জানে-
তুমি নাহি জান-
আমি নাহি জানি।
চেনে তা প্রেম, জানে শুধু প্রাণ-
কোথা হ’তে আসে এত অকারণে প্রাণে প্রাণে বেদনার টান!

নাহি বুঝিয়াও আমি সেদিন বুঝিনু তাই, হে অপরিচিতা!
চির-পরিচিতা তুমি, জন্ম জন্ম ধ’রে অনাদৃতা সীতা!
কানন-কাঁদানো তুমি তাপস-বালিকা
অনন- কুমারী সতী, তব দেব-পূজার থালিকা
ভাঙিয়াছি যুগে যুগে, ছিঁড়িয়াছি মালা
খেলা-ছলে; চিন-মৌনা শাপভ্রষ্টা ওগো দেববালা!
নীরবে স’য়েছ সবি-
সহজিয়া! সহজে জেনেছ তুমি, তুমি মোর জয়লক্ষ্মী, আমি তব কবি।
তারপর-নিশি শেষে পাশে ব’সে শুনেছিনু তব গীত-সুর
লাজে-আধ-বাধ-বাধ শঙ্কিত বিধুর;
সুর শুনে হ’ল মনে- ক্ষণে ক্ষণে
মনে-পড়ে-পড়ে না হারা কন্ঠ যেন
কেঁদে কেঁদে সাধে, ‘ওগো চেন মোরে জন্মে জন্মে চেন।’
মথুরায় গিয়ে শ্যাম, রাধিকার ভুলেছিল যবে,
মনে লাগে- এই সুর গীত-রবে কেঁদেছিল রাধা,
অবহেলা-বেঁধা-বুক নিয়ে এ যেন রে অতি-অন-রালে ললিতার কাঁদা
বন-মাঝে একাকিনী দময়ন-ী ঘুরে ঘুরে ঝুরে,
ফেলে-যাওয়া নাথে তার ডেকেছিল ক্লান–কন্ঠে এই গীত-সুরে।
কানে- প’ড়ে মনে
বনলতা সনে
বিষাদিনী শকুন-লা কেঁদেছিল এই সুরে বনে সঙ্গোপনে।
হেম-গিরি-শিরে
হারা-সতী উমা হ’য়ে ফিরে
ডেকেছিল ভোলানাথে এমনি সে চেনা কন্ঠে হায়,
কেঁদেছিল চির-সতী পতি প্রিয়া প্রিয়ে তার পেতে পুনরায়!-
চিনিলাম বুঝিলাম সবি-
যৌবন সে জাগিল না, লাগিল না মর্মে তাই গাঢ় হ’য়ে তব মুখ-ছবি।

তবু তব চেনা কন্ঠ মম কন্ঠ -সুর
রেখে আমি চ’লে গেনু কবে কোন্‌ পল্লী-পথে দূরে!–
দু’দিন না যেতে যেতে এ কি সেই পুণ্য গোমতীর কূলে
প্রথম উঠিল কাঁদি’ অপরূপ ব্যথা-গন্ধ নাভি-পদ্ম-মুলে!

খুঁজে ফিরি কোথা হ’তে এই ব্যাথা-ভারাতুর মদ-গন্ধ আসে-
আকাশ বাতাস ধরা কেঁপে কেঁপে ওঠে শুধু মোর তপ্ত ঘন দীর্ঘশ্বাসে।
কেঁদে ওঠে লতা-পাতা,
ফুল পাখি নদীজল
মেঘ বায়ু কাঁদে সবি অবিরল,
কাঁদে বুকে উগ্রসুখে যৌবন-জ্বালায়-জাগা অতৃপ্ত বিধাতা!
পোড়া প্রাণ জানিল না কারে চাই,
চীৎকারিয়া ফেরে তাই-‘কোথা যাই,
কোথা গেলে ভালোবাসাবাসি পাই?
হু-হু ক’রে ওঠে প্রাণ, মন করে উদাস-উদাস,
মনে হয়-এ নিখিল যৌবন-আতুর কোনো প্রেমিকের ব্যথিত হুতাশ!
চোখ পুরে’ লাল নীল কত রাঙা, আবছায়া ভাসে, আসে-আসে-
কার বক্ষ টুটে
মম প্রাণ-পুটে
কোথা হ’তে কেন এই মৃগ-মদ-গন্ধ-ব্যথা আসে?
মন-মৃগ ছুটে ফেরে; দিগন-র দুলি’ ওঠে মোর ক্ষিপ্ত হাহাকার-ত্রাসে!
কস’রী হরিণ-সম
আমারি নাভির গন্ধ খুঁজে ফেলে গন্ধ-অন্ধ মন-মৃগ মম!
আপনারই ভালোবাসা
আপনি পিইয়া চাহে মিটাইতে আপনার আশা!
অনন- অগস-্য-তৃষাকুল বিশ্ব-মাগা যৌবন আমার
এক সিন্ধু শুষি’ বিন্দু-সম, মাগে সিন্ধু আর!
ভগবান! ভগবান! এ কি তৃষ্ণা অনন- অপার!
কোথা তৃপ্তি? তৃপ্তি কোথা? কোথা মোর তৃষ্ণা-হরা প্রেম-সিন্ধু
অনাদি পাথার!
মোর চেয়ে স্বে”ছাচারী দুরন- দুর্বার!
কোথা গেলে তারে পাই,
যার লাগি’ এত বড় বিশ্বে মোর নাই শানি- নাই!
ভাবি আর চলি শুধু, শুধু পথ চলি,
পথে কত পথ-বালা যায়,
তারি পাছে হায় অন্ধ-বেগে ধায়
ভালোবাসা-ক্ষুধাতুর মন,
পিছু ফিরে কেহ যদি চায়, ‘ভিক্ষা লহ’ ব’লে কেহ আসে দ্বার-পাশে।
প্রাণ আরো কেঁদে ওঠে তাতে,
গুমরিয়া ওঠে কাঙালের লজ্জাহীন গুর” বেদনাতে!
প্রলয়-পয়োধি-নীরে গর্জে-ওঠা হুহুঙ্কার-সম
বেদনা ও অভিমানে ফুলে’ ফুলে’ দুলে’ ওঠে ধূ-ধূ
ক্ষোভ-ক্ষিপ্ত প্রাণ-শিখা মম!
পথ-বালা আসে ভিক্ষা-হাতে,
লাথি মেরে চুর্ণ করি গর্ব তার ভিক্ষা-পাত্র সাথে।
কেঁদে তারা ফিরে যায়, ভয়ে কেহ নাহি আসে কাছে;
‘অনাথপিন্ডদ’-সম
মহাভিক্ষু প্রাণ মম
প্রেম-বুদ্ধ লাগি’ হায় দ্বারে দ্বারে মহাভিক্ষা যাচে,
“ভিক্ষা দাও, পুরবাসি!
বুদ্ধ লাগি’ ভিক্ষা মাগি, দ্বার হ’তে প্রভু ফিরে যায় উপবাসী!’’
কত এল কত গেল ফিরে,-
কেহ ভয়ে কেহ-বা বিস্ময়ে!
ভাঙা-বুকে কেহ,
কেহ অশ্র”-নীরে-
কত এল কত গেল ফিরে!
আমি যাচি পূর্ণ সমর্পণ,
বুঝিতে পারে না তাহা গৃহ-সুখী পুরনারীগণ।
তারা আসে হেসে;
শেষে হাসি-শেষে
কেঁদে তারা ফিরে যায়
আপনার গৃহ স্নেহ”ছায়ে।
বলে তারা, “হে পথিক! বল বল তব প্রাণ কোন্‌ ধন মাগে?
সুরে তব এত কান্না, বুকে তব কা’র লাগি এত ক্ষুধা জাগে?
কি যে চাই বুঝে না ক’ কেহ,
কেহ আনে প্রাণ মম কেহ- বা যৌবন ধন,
কেহ রূপ দেহ।
গর্বিতা ধনিকা আসে মদমত্তা আপনার ধনে
আমারে বাঁধিতে চাহে রূপ-ফাঁদে যৌবনের বনে।….
সর্ব ব্যর্থ, ফিরে চলে নিরাশায় প্রাণ
পথে পথে গেয়ে গেয়ে গান-
“কোথা মোর ভিখারিনী পূজারিণী কই?
যে বলিবে-‘ভালোবেসে সন্ন্যাসিনী আমি
ওগো মোর স্বামি!
রিক্তা আমি, আমি তব গরবিনী,বিজয়িনী নই!”
মর” মাঝে ছুটে ফিরি বৃথা,
হু হু ক’রে জ্ব’লে ওঠে তৃষা-
তারি মাঝে তৃষ্ণা-দগ্ধ প্রাণ
ক্ষণেকের তরে কবে হারাইল দিশা।
দূরে কার দেখা গেল হাতছানি যেন-
ডেকে ডেকে সে-ও কাঁদে-
‘আমি নাথ তব ভিখারিনী,
আমি তোমা’ চিনি,
তুমি মোরে চেন।’
বুঝিনু না, ডাকিনীর ডাক এ যে,
এ যে মিথ্যা মায়া,
জল নহে, এ যে খল, এ যে ছল মরীচিকা ছাষা!
‘ভিক্ষা দাও’ ব’লে আমি এনু তার দ্বারে,
কোথা ভিখারিনী? ওগো এ যে মিথ্যা মায়াবিনী,
ঘরে ডেকে মারে।
এ যে ক্রূর নিষাদের ফাঁদ,
এ যে ছলে জিনে নিতে চাহে ভিখারীর ঝুলির প্রসাদ।
হ’ল না সে জয়ী,
আপনার জালে প’ড়ে আপনি মরিল মিথ্যাময়ী।
কাঁটা-বেঁধা রক্ত মাথা প্রাণ নিয়ে এনু তব পুরে,
জানি নাই ব্যথাহত আমার ব্যথায়
তখনো তোমার প্রাণ পুড়ে।
তবু কেন কতবার মনে যেন হ’ত,
তব স্নিগ্ধ মদিন পরশ মুছে নিতে পারে মোর
সব জ্বালা সব দগ্ধ ক্ষত।
মনে হ’ত প্রাণে তব প্রাণে যেন কাঁদে অহরহ-
‘হে পথিক! ঐ কাঁটা মোরে দাও, কোথা তব ব্যথা বাজে
কহ মোরে কহ!
নীরব গোপন তুমি মৌন তাপসিনী,
তাই তব চির-মৌন ভাষা
শুনিয়াও শুনি নাই, বুঝিয়াও বুঝি নাই ঐ ক্ষুদ্র চাপা-বুকে
কাঁদে কত ভালোবাসা আশা!
এরি মাঝে কোথা হ’তে ভেসে এল মুক্তধারা মা আমার
সে ঝড়ের রাতে,
কোলে তুলে নিল মোরে, শত শত চুমা দিল সিক্ত আঁখি-পাতে।
কোথা গেল পথ-
কোথা গেল রথ-
ডুবে গেল সব শোক-জ্বালা,
জননীর ভালোবাসা এ ভাঙা দেউলে যেন দুলাইল দেয়ালীর আলা!
গত কথা গত জন্ম হেন
হারা-মায়ে পেয়ে আমি ভুলে গেনু যেন।
গৃহহারা গৃহ পেনু, অতি শান- সুখে
কত জন্ম পরে আমি প্রাণ ভ’রে ঘুমাইনু মুখ থুয়ে জননীর বুকে।
শেষ হ’ল পথ-গান গাওয়া,
ডেকে ডেকে ফিরে গেল হা-হা স্বরে পথসাথী তুফানের হাওয়া।
আবার আবার বুঝি ভুলিলাম পথ-
বুঝি কোন্‌ বিজয়িনী-দ্বার প্রানে- আসি’ বাধা পেল পার্থ-পথ-রথ।
ভুলে গেনু কারে মোর পথে পথ খোঁজা,-
ভুলে গেনু প্রাণ মোর নিত্যকাল ধ’রে অভিসারী
মাগে কোন্‌ পূজা,
ভুলে গেনু যত ব্যথা শোক,-
নব সুখ-অশ্র”ধারে গ’লে গেল হিয়া, ভিজে গেল অশ্র”হীন চোখ।
যেন কোন্‌ রূপ-কমলেতে মোর ডুবে গেল আঁখি,
সুরভিতে মেতে উঠে বুক,
উলসিয়া বিলসিয়া উথলিল প্রাণে
এ কী ব্যগ্র উগ্র ব্যথা-সুখ।
বাঁচিয়া নূতন ক’রে মরিল আবার
সীধু-লোভী বাণ-বেঁধা পাখী।….
…. ভেসে গেল রক্তে মোর মন্দিরের বেদী-
জাগিল না পাষাণ-প্রতিমা,
অপমানে দাবানল-সম তেজে
র”খিয়া উঠিল এইবার যত মোর ব্যথা-অর”নিমা।
হুঙ্কারিয়া ছুটিলাম বিদ্রোহের রক্ত-অশ্বে চড়ি’
বেদনার আদি-হেতু স্রষ্টা পানে মেঘ অভ্রভেদী,
ধূমধ্বজ প্রলয়ের ধূমকেতু-ধুমে
হিংসা হোমশিখা জ্বালি’ সৃজিলাম বিভীষিকা স্নেহ-মরা শুষ্ক মর”ভূমে।
…. এ কি মায়া! তার মাঝে মাঝে
মনে হ’ত কতদূরে হ’তে, প্রিয় মোর নাম ধ’রে যেন তব বীণা বাজে!
সে সুদূর গোপন পথের পানে চেয়ে
হিংসা-রক্ত-আঁখি মোর অশ্র”রাঙা বেদনার রসে যেত ছেয়ে।
সেই সুর সেই ডাক স্মরি’ স্মরি’
ভুলিলাম অতীতের জ্বালা,
বুঝিলাম তুমি সত্য-তুমি আছে,
অনাদৃতা তুমি মোর, তুমি মোরে মনে প্রাণে যাচ’,
একা তুমি বনবালা
মোর তরে গাঁথিতেছ মালা
আপনার মনে
লাজে সঙ্গোপনে।
জন্ম জন্ম ধ’রে চাওয়া তুমি মোর সেই ভিখারিনী।
অন-রের অগ্নি-সিন্ধু ফুল হ’য়ে হেসে উঠে কহে- ‘চিনি, চিনি।
বেঁচে ওঠ্‌ মরা প্রাণ! ডাকে তোরে দূর হ’তে সেই-
যার তরে এত বড় বিশ্বে তোর সুখ-শানি- নেই!’
তারি মাঝে
কাহার ক্রন্দন-ধ্বনি বাজে?
কে যেন রে পিছু ডেকে চীৎকারিয়া কয়-
‘বন্ধু এ যে অবেলায়! হতভাগ্য, এ যে অসময়!
শুনিনু না মানা, মানিনু না বাধা,
প্রাণে শুধু ভেসে আসে জন্মন-র হ’তে যেন বিরহিণী ললিতার কাঁদা!
ছুটে এনু তব পাশে
উর্ধ্বশ্বাসে,
মৃত্যু-পথ অগ্নি-রথ কোথা প’ড়ে কাঁদে, রক্ত-কেতু গেল উড়ে পুড়ে,
তোমার গোপান পূজা বিশ্বের আরাম নিয়া এলো বুক জুড়ে।

তারপর যা বলিব হারায়েছি আজ তার ভাষা;
আজ মোর প্রাণ নাই, অশ্র” নাই, নাই শক্তি আশা।
যা বলিব আজ ইহা গান নহে, ইহা শুধু রক্ত-ঝরা প্রাণ-রাঙা
অশ্র”-ভাঙা ভাষা।
ভাবিতেছ, লজ্জাহীন ভিখারীর প্রাণ-
সে-ও চাহে দেওয়ার সম্মান!
সত্য প্রিয়া, সত্য ইহা, আমিও তা স্মরি’
আজ শুধু হেসে হেসে মরি!
তবু শুধু এইটুকু জেনে রাখো প্রিয়তমা, দ্বার হ’তে দ্বারান-রে
ব্যর্থ হ’য়ে ফিরে
এসেছিনু তব পাশে, জীবনের শেষ চাওয়া চেয়েছিনু তোমা’,
প্রাণের সকল আশা সব প্রেম ভালোবাসা দিয়া
তোমারে পূজিয়াছিনু, ওগো মোর বে-দরদী পূজারিণী প্রিয়া!
ভেবেছিনু, বিশ্ব যারে পারে নাই তুমি নেবে তার ভার হেসে,
বিশ্ব-বিদ্রোহীরে তুমি করিবে শাসন
অবহেলে শুধু ভালোবাসে।
ভেবেছিনু, দুর্বিনীত দুর্জয়ীরে জয়ের গরবে
তব প্রাণে উদ্ভাসিবে অপরূপ জ্যোতি, তারপর একদিন
তুমি মোর এ বাহুতে মহাশক্তি সঞ্চারিয়া
বিদ্রোহীর জয়লক্ষ্মী হবে।
ছিল আশা, ছিল শক্তি, বিশ্বটারে টেনে
ছিঁড়ে তব রাঙা পদতলে ছিন্ন রাঙা পদ্মসম পূজা দেব এনে!
কিন’ হায়! কোথা সেই তুমি? কোথা সেই প্রাণ?
কোথা সেই নাড়ী-ছেঁড়া প্রাণে প্রাণে টান?
এ-তুমি আজ সে-তুমি তো নহ;
আজ হেরি-তুমিও ছলনাময়ী,
তুমিও হইতে চাও মিথ্যা দিয়া জয়ী!
কিছু মোরে দিতে চাও, অন্য তরে রাখ কিছু বাকী,-
দুর্ভাগিনী! দেখে হেসে মরি! কারে তুমি দিতে চাও ফাঁকি?
মোর বুকে জাগিছেন অহরহ সত্য ভগবান,
তাঁর দৃষ্টি বড় তীক্ষ্ন, এ দৃষ্টি যাহারে দেখে,
তন্ন তন্ন ক’রে খুঁজে দেখে তার প্রাণ!
লোভে আজ তব পূজা কলুষিত, প্রিয়া,
আজ তারে ভুলাইতে চাহ,
যারে তুমি পূজেছিলে পূর্ণ মন-প্রাণ সমর্পিয়া।
তাই আজি ভাবি, কার দোষে-
অকলঙ্ক তব হৃদি-পুরে
জ্বলিল এ মরণের আলো কবে প’শে?
তবু ভাবি, এ কি সত্য? তুমিও ছলনাময়ী?
যদি তাই হয়, তবে মায়াবিনী অয়ি!
ওরে দুষ্ট, তাই সত্য হোক।
জ্বালো তবে ভালো ক’রে জ্বালো মিথ্যালোক।
আমি তুমি সুর্য চন্দ্র গ্রহ তারা
সব মিথ্যা হোক;
জ্বালো ওরে মিথ্যাময়ী, জ্বালো তবে ভালো ক’রে
জ্বালো মিথ্যালোক।
তব মুখপানে চেয়ে আজ
বাজ-সম বাজে মর্মে লাজ;
তব অনাদর অবহেলা স্মরি’ স্মরি’
তারি সাথে স্মরি’ মোর নির্লজ্জতা
আমি আজ প্রাণে প্রাণে মরি।
মনে হয়-ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠি, ‘মা বসুধা দ্বিধা হও!
ঘৃণাহত মাটিমাখা ছেলেরে তোমার
এ নির্লজ্জ মুখ-দেখা আলো হ’তে অন্ধকারে টেনে লও!
তবু বারে বারে আসি আশা-পথ বাহি’,
কিন’ হায়, যখনই ও-মুখ পানে চাহি-
মনে হয়,-হায়,হায়, কোথা সেই পূজারিণী,
কোথা সেই রিক্ত সন্ন্যাসিনী?
এ যে সেই চির-পরিচিত অবহেলা,
এ যে সেই চির-ভাবহীন মুখ!
পূর্ণা নয়, এ যে সেই প্রাণ নিয়ে ফাঁকি-
অপমানে ফেটে যায় বুক!
প্রাণ নিয়া এ কি নিদার”ণ খেলা খেলে এরা হায়!
রক্ত-ঝরা রাঙা বুক দ’লে অলক্তক পরে এরা পায়!
এর দেবী, এরা লোভী, এরা চাহে সর্বজন-প্রীতি!
ইহাদের তরে নহে প্রেমিকের পূর্ণ পূজা, পূজারীর পূর্ণ সমর্পণ,
পূজা হেরি’ ইহাদের ভীর” বুকে তাই জাগে এত সত্য-ভীতি।
নারী নাহি হ’তে চায় শুধু একা কারো,
এরা দেবী, এরা লোভী, যত পূজা পায় এরা চায় তত আরো!
ইহাদের অতিলোভী মন
একজনে তৃপ্ত নয়, এক পেয়ে সুখী নয়,
যাচে বহু জন।..
যে-পূজা পূজিনি আমি স্রষ্টা ভগবানে,
যারে দিনু সেই পূজা সে-ই আজি প্রতারণা হানে।
বুঝিয়াছি, শেষবার ঘিরে আসে সাথী মোর মৃত্যু-ঘন আঁখি,
রিক্ত প্রাণ তিক্ত সুখে হুঙ্কারিয়া উঠে তাই,
কার তরে ওরে মন, আর কেন পথে পথে কাঁদি?
জ্বলে’ ওঠ্‌ এইবার মহাকাল ভৈরবের নেত্রজ্বালা সম ধ্বক্‌-ধ্বক্‌,
হাহাকার-করতালি বাজা! জ্বালা তোর বিদ্রোহের রক্তশিখা অনন- পাবক।
আন্‌ তোর বহ্নি-রথ, বাজা তোর সর্বনাশী তূরী!
হান্‌ তোর পরশু-ত্রিশুল! ধ্বংস কর্‌ এই মিথ্যাপুরী।
রক্ত-সুধা-বিষ আন্‌ মরণের ধর টিপে টুটি!
এ মিথ্যা জগৎ তোর অভিশপ্ত জগদ্দল চাপে হোক্‌ কুটি-কুটি!
কন্ঠে আজ এত বিষ, এত জ্বালা,
তবু, বালা,
থেকে থেকে মনে পড়ে-
যতদিন বাসিনি তোমারে ভালো,
যতদিন দেখিনি তোমার বুক-ঢাকা রাগ-রাঙা আলো,
তুমি ততদিনই
যেচেছিলে প্রেম মোর, ততদিনই ছিলে ভিখারিনী।
ততদিনই এতটুকু অনাদরে বিদ্রোহের তিক্ত অভিমানে
তব চোখে উছলাতো জল, ব্যথা দিত তব কাঁচা প্রাণে;
একটু আদর-কণা একটুকু সোহাগের লাগি’
কত নিশি-দিন তুমি মনে কর, মোর পাশে রহিয়াছ জাগি’,
আমি চেয়ে দেখি নাই; তারই প্রতিশোধ
নিলে বুঝি এতদিনে! মিথ্যা দিয়ে মোরে জিনে
অপমান ফাঁকি দিয়ে করিতেছ মোর শ্বাস-রোধ!
আজ আমি মরণের বুক থেকে কাঁদি-
অকর”ণা! প্রাণ নিয়ে এ কি মিথ্যা অকর”ণ খেলা!
এত ভালোবেসে শেষে এত অবহেলা
কেমনে হানিতে পার, নারী!
এ আঘাত পুর”ষের,
হানিতে এ নির্মম আঘাত, জানিতাম মোরা শুধু পুর”ষেরা পারি।
ভাবিতাম, দাগহীন অকলঙ্ক কুমারীর দান,
একটি নিমেষ মাঝে চিরতরে আপনারে রিক্ত করি’ দিয়া
মন-প্রাণ লভে অবসান।
ভুল, তাহা ভুল
বায়ু শুধু ফোটায় কলিকা, অলি এসে হ’রে নেয় ফুল!
বায়ু বলী, তার তরে প্রেম নহে প্রিয়া!
অলি শুধু জানে ভালো কেমনে দলিতে হয় ফুল-কলি-হিয়া!
পথিক-দখিনা-বায়ু আমি চলিলাম বসনে-র শেষে
মৃত্যুহীন চিররাত্রি নাহি-জানা দেশে!
বিদায়ের বেলা মোর ক্ষণে ক্ষণে ওঠে বুকে আনন্দাশ্র” ভরি’
কত সুখী আমি আজ সেই কথা স্মরি’!
আমি না বাসিতে ভালো তুমি আগে বেসেছিলে ভালো,
কুমারী-বুকের তব সব স্নিগ্ধ রাগ-রাঙা আলো
প্রথম পড়িয়াছিল মোর বুকে-মুখে-
ভুখারীর ভাঙা বুকে পুলকের রাঙা বান ডেকে যায় আজ সেই সুখে!
সেই প্রীতি, সেই রাঙা সুখ-স্মৃতি স্মরি’
মনে হয় এ জীবন এ জনম ধন্য হ’ল- আমি আজ তৃপ্ত হ’য়ে মরি!
না-চাহিতে বেসেছিলে ভালো মোরে তুমি-শুধু তুমি,
সেই সুখে মৃত্যু-কৃষ্ণ অধর ভরিয়া
আজ আমি শতবার ক’রে তব প্রিয় নাম চুমি’।
মোরে মনে প’ড়ে-
একদা নিশীথে যদি প্রিয়
ঘুশায়ে কাহারও বুকে অকারণে বুক ব্যথা করে,
মনে ক’রো, মরিয়াছে, গিয়াছে আপদ!
আর কভু আসিবে না
উগ্র সুখে কেহ তব চুমিতে ও-পদ-কোকনদ!
মরিয়াছে-অশান- অতৃপ্ত চির-স্বার্থপর লোভী,-
অমর হইয়া আছে-র’বে চিরদিন
তব প্রেমে মৃত্যুঞ্জয়ী
ব্যথা-বিষে নীলকণ্ঠ কবি!

The Worshipper
Translation: Abdul Hakim

After all, at this late hour,
Beloved!
Like a whirlwind blind with dust
Day and Night
When I
Dance about in a blood-red Death-game
At long last, at this eleventh hour
It is revealed to me that! know thee through
all Eternity.
Worshipper!
Thy voice, thy tune shaming the dove,
Thy eye, thy face,
Thy eye-brow, forehead, cheek,
Thy beauty that knows no equal,
Thy wanton ear-ring swinging to and fro
in dance surpassing a swan �
I know, I know all!
Hence, after all, I
Standing on the one, weary, hopeless
and dreary beach of life
From the depths of my fainting heart
Cry for thee and thee alone,
Beloved!
Calling by the sweetest name which is constantly
on my lips as a sacred name on the rosary.
I weep with it --
In my broken voice do I cry, I know thee,
I do, do, do know,
Thou art not one with laurels of victory - nor
art thou a beggar-maid,
Thou art virgin nymph, daughter of an
eremite, thou art my eternal worshipper!
Through ages, thou hast loved this hard-hearted one,
Burning thy own self, thou hast kindled light
in my breast, [end of page 128]
Many a time thou hast made me a debtor
to thy worship.
I know thee, Beloved, I do, do, do know through
Eternity. �
I oft recognize thee in the sun-set
of life, at the hour of death,
Then after recognition
Thou dost go elsewhere .
Leaving me on the lone, deserted
Farewell-raft.
Sitting at the end of the day, bathed in tears,
I recall her far-off, distant memory�
I remember the sad, silent welcome night
of mine that came at the close of spring
When my eyes feasted upon thine and were blessed,

Till then a simple, happy boy - my
youth did not put forth blossoms,
Like approaching, aching, eager Dawn
Half-asleep, half-awake was my boyhood,
My rosy nights went blooming
Free of all barriers, ,
Like a whirlwind spontaneously moving
Or the speed of fiery lyrics, or
laughter that knows no end
A wandering traveller from far afar,
I took thee
And along with thee
Came tearful eyes and pangs of homeless forlorn
heart--- �
Thou didst come at night, at peep of Dawn,
I sang "Awake, Beloved, Awake!"
Thou didst rise from sleep, thou didst come to me,
And looking at my face didst smile a
melancholy smile --
At thy smile I wept - whose tame bird distressed
art thou, now deprived of thy forest
home?
O the message of thine eyes! methought
That voice, that tune of mine
Laden with sadness of separation,
And reverberating in the forest, [end of page 129]
Which invites the south wind, causes
the flower to blossom and charms the wild doe,
Thou hast known all of myself since the dawn of
creation!
Then, that midnight I did sing
plaintive notes choked with tears of that
unhonoured send-off and wounded feelings.
I did not know whom by the incantation of a song
I wanted then to imprison in my
ever-desolate forlorn heart�
Only this I do know that the shade of
thy love-enkindled eyes untimely roused from sleep
Fell upon my eyes.
I saw, too, in the expression of those eyes,
A flood of light mixed with surprise and delight,
A flow of fascination born of profound pain, �
With silent sympathy was trembling the love-lorn heart
In the likeness of the dark night�
To my thirsty eyes was expectantly welcome,
Worshipper! that sweet, tender light
kindled in the lamp of thy eyes!�
Then, at the close of singing .
With a smile I think I called thee near, by the
name �
Suddenly didst thon storm with a pent up
feeling of self-respect offended
(Who knoweth why) .
Like a canoe trembled thy serene eyes
Secured with eye brows,
The swelling water through the mouth
of the fount of agony
Fell in torrents!

Such flood of tears gushing out of thy
depths on a little caress
Where didst thou get, O Neglected!
my wandering Beloved?
Tell me, O tell! [end of page 130]
On this broken bosom,
Pillow thy bright face bathed in tears
With a thrill of bashful joy
And tell me, a tell !
Why seeing me art thou overwhelmed with
an undefined feeling?
Why at my call such abundance of tears
overflows thy eyes?
An unknown vagrant wayfarer am I,
Seeing me why tears start to thy
virgin eyes serene?
Others laugh at me;
A happy, secure nest is burnt at .
the very touch of my accursed hot breath,
Taking it to be a jewel some people
wear it as a garland,
But when it turns to be a venomous serpent
And bites them in the breast,
Forthwith they trample it under foot!
With one who is disliked, hated and
disregarded by the world,
Forlorn Beloved! Why dost thou
play this sad game
For one why this secret sensibility?
On what right
The mere calling by name doth cause pain to thee?
Art thou loved by nobody? Art thou
tenderly taken by nobody? Art thou
tenderly taken by none?
From birth art thou neglected as
a Beggar maid? And for that
Such abundant flow of tears and
Such offended spirit exciting compassion?
No, not even that
In a forlorn voice while resting on the breast
Who doth in forlorn sensitiveness Say�
'No, not even that'!
I saw hundreds come to this house,
Many of their own accord take thee on their breast,
Still yet in thy eyes and face is writ
large a deep discontent and a profound [end of page 131]
Pining for love!
Why at my sight doth so much nectar
of love overflow thy breast?
O Mystry ! My Queen!
Nobody doth know �
Thou knowest not �
Nor do I know.
Love alone knoweth, heart alone doth feel
From whence cometh such poignancy of
Spontaneous attraction of heart to heart.
Even without understanding it, I understood
That day, O unknown! that thou
art eternally know to me, thou my
neglected Sita in every successive birth!
Thou hermit's daughter deserting thy forest home,
Eternal virginity; thy tray of offerings to Gods
I broke in every age, thy garland I tore
In mere sport; ever-silent, ever languishing
under a curse, O heavenly damsel!
In silence didst thou suffer �
O thou Simple! Simply hast thou
Known thou art my-Queen of
Victory, myself thy Poet.
Then, towards the end of night
Sitting by thy side
I heard thy melodious song,
Half-interrupted by bashfulness,
tremblingly pathetic �
Oft the voice reminded me
Of some dim, half-remembered,
half-forgotten, long-lost thing,
Singing in choked voice 'O thou' !
When krishna went to Mathura and forgot
his beloved Radhika,
Methink, she wept out her forlorn
heart singing such sweetest saddest song.
With a breast afflicted by neglect,
it was much like Lalita's lamentation
in secret hour!
Perhaps in lonely forest, alone, wandering, [end of page 132]
Damayanti sang in such tired voice
Calling her husband woo was left behind!
Perhaps sad sakuntala remembering her husband
Wept with the forest creepers singing
in such tune, in secret leafy nook!
Perhaps on the peak of the Hem-giri mountain
The long-lost Sati in the person of Uma
Addressed Bholanath in such ever known voice!
Wept she, ever-faithful, beloved of her
husband, to get again her eternal lover !
I see and understand everything,
My youth did not awake, so thy fair face
made no deep impress on my inward eye;
Yet in thy familiar voice my own
I left and went afar in some unremembered
moment along a nameless village path �
Scarcely a day or two passed when
on the bank of the same holy Gomati
My heart ached for the first time and a
Strange, fragrant pain I felt in
the lotus of my navel region.
I wandered to-and fro in search of
the source of this pain-laden smell of wine �
At the mere touch of my hot, heavy
sighs, trembled the sky, air and earth,
Bewailed leaves and creepers,
Flowers and birds and rivers, .
Bewailed clouds and winds and all,
And bewailed in the breast in fierce
pleasure the insatiate divinity awakened
by youth's tyranny: .
Wretched as I was, I knew not whom I wanted,
So I cried hoarse, 'Where should .
I go, where may I find my Beloved?'
My heart feels a burning passion,
my mind runs riot,
Methink, it is the sad lamentation
of a lover under the load of eternal youth!
Visions float in quick success on
before the eyes of many a color, [end of page 133]
red, blue, pink �
From whose breast
To my heart of hearts
Doth come and why this painful ecstasy
redolent of musk?
My mind like the musk deer runs a-field.
the air trembles with fear engendered by
my frantic wailings! .
Like the musk of deer
My mind blind with scent roams in
Search of the odour of my own navel!
Mine own love
By drinking itself wants to appease
its own thirst!
My youth under an eternal thirst for
the whole world of love
After emptying an ocean like a drop
longs for another!
Good Heaven! What thirst eternal,
illimitable is this!
Where is contentment? O where?
Where is the Eternal Ocean of Love that
can appease my thirst?
More self-willed, tyrannical, and irresistible than I
Where might I find her
In absence of whom I know no peace
in this wide world!
Thinking like this I go abroad, I only
walk my way,
And meet many a girl on the path,
After them, alas! runs with blind impetuosity
My mind hungering for Love,
If one of them looks back, my
offended sentiment brings a flood
of tears to my eyes!
They laugh at my predicament, .
Some one ignores me, some one
approaches with an offer of favour !
It doth aggravate my grief,
With the deep naked agony of a wretched one, [end of page 134]
Like the loud roar of the ocean of
universal cataclysm
Under pain and wounded self-respect
. doth swell in fierce volume
The flame of my heart agitated with distress!
A street girl doth offer favour!
Under my foot I smash her vanity .
with her presumptuous offer!
In tears she goes back, afraid of coming near;
Like Anath Pindada, disciple of Buddha,
My mendicant heart
Hegs from door to door no common alms
For my love-Buddha,
�Give me alms, O citizens!
I beg for Buddha, see my master
goes back hungry from the door!
Many came, many went away, .
Some in fright, some in surprise,
Some with a broken heart,
Some bathed in tears �
Thus many a nymph came and went,
I beseech complete surrender,
But it is not understood by the happy damsels
of the city
They carne with a smile,
Then at the end of the smile
In tears they go back
To the shady nook of their living home
They say, "O way-farer ! Tell us, O tell�
What Treasure doth thy heart hanker after? .
Why is this pathos in thy voice, for whom
is there so much hunger in "thy breast ?"
No body understands what I want
Some "rings mind and heart, some brings
Youth and wealth,
While a third offers beauty and body.
A proud princess maddened by her riches
Wants to imprison me in the trap of her
beauty and youth...
All in vain! Loaded with despondency ,
my heart goes abroad [end of page 135]
As a vagrant warbler �
Singing "where is my love-loran Beloved
my worshipper, Oh, where?"
She who will say, "I have turned
an anchorite for the sake of love,
O thou my Lord!'
Forlorn am I and not
thy pride and glory
In vain I roam in the wilderness
My thirst rages fiercely
In such moments my thirst-stricken heart
Loses itself for a moment
At a distant, unknown beckoning with the hand
As if she were weeping aloud-,�
Saying 'My Love, I am thy heart's wandering maid,
I know thee
Thou, too, knowest me !
I knew not, it was a she-devil,
It was but an illusion,
No water, but a snare, it was a
deceptive image of a lake in the desert !'�
'I am at thy mercy', so saying I
called at her door,
Alas, where was she? Verily it was a witch
Alluring me to my doom!
It was a cruel Fowler's net,
It was a device to win the grace
. of a Beggar's bowel,
No, the trap did defeat itself, .
Entangled in her own snare was
finished the witch �
To thy door came I with my heart
bleeding from thorns,
Knew not, even then, thou didst feel
a keen sympathy for my afflictions.
Yet from time to time it struck me
that thy sweet, balmy touch could efface
All my bums and pangs,
That to my heart spoke thy heart ever in tears

O way-farer ! Give me those thorns; [end of page 136]
Where do they prick thee,
Tell mc, pray!
Thou art a silent eremite, keeping in
thy lone privacy,
Hence thy speechless message
I seldom minded, and little understood
that and thy little reserved bosom
There was so much room for love and hope.
Meanwhile I knew not from where
came my mother floating as it were
like a free stream,
In that stormy night.
She took me in her lap, printed a
thousand kisses on my eyes bathed in tears.
The thoroughfare vanished
�The chariot disappeared �
Drowned was all sorrow and pain,
A mother's love illumined my dilapidate
temple like the festival of Dewali!
My past history like the previous birth
I seemed to forget on getting back
my lost Mother!
A homeless one was restored to his
home, in tranquil happiness and felicity.
After many an age as it were, I slept a
deep sleep pillowed on my Mother's breast.
There was an end of vagrant minstrelsy,
Disappeared in a piteous
lone my companion the tempestuous wind.

0 0 0

Again, again was I benighted �
Perhaps at the door of some all-conquering
nymph, Arjun's chariot came to a stand-still.
I forgot the object of my peregrination,
I forgot. my heart had been eternally wandering
and longing for my Beloved, Beloved and Beloved
alone.
I forgot every bit of pain and grief,�
The flood of new felicity melted my heart,
And over-flowed my tearless eyes. [end of page 137]
It seemed as it were in some lotus of
beauty were imprisoned my eyes,
Its fragrance enraptured my bosom,
And a thrill danced through
some sweetest, saddest sensation.
Life regained and forfeited again
The greedy bird pierced by an arrow
Besmeared with blood the altar of my temple
It could not wake up the stone-image,
Being thus disgraced, I leapt up like a
forest conflagration.
My poignant, blood-red griefs raised their heads,
With a thundering voice I rushed forth
on the blood-horse of Rebellion,
Against the Original Cause of my
Sorrow the Creator --- across the clouds of the sky
Holding aloft the meteor flag of Destruction,
Kindling the sacrificial fire of animosity
and creating terror in a barren dreary desert!
�What illusion is this! At intervals
Methought I heard a distant melody
of thy flute singing my name, Dear !
Peering into that far-off privacy
My eyes red with enmity became
Softened with tears of silent Sympathy.
Remembering that melody, remembering that call
discarded all my grief
I threw my grief into oblivion,
I do realize, thou art real-thou dost exist,
Neglected by me, thou dost still desire me,
heart and soul,
Alone, wood-nymph,
Thou art wreathing a garland for me
All by thyself,
In bashful privacy.
Thou art my wandering maid, my Queen,
Whom I wood in all my previous births! �
The ocean of fire in me becomes a flower
in bloom and says with a smile �
"I know, I know".
Let life return to my dead soul. [end of page 138]
From a-far am I summoned by her,
Without whom I know no peace and joy
in the wide world.
But hearken!
Who wails and laments like that?
Some body must have cried from behind �
'Friend, thou art behind time' Poor fellow,
it is too late!
I didn't listen, I didn't mind obstruction,
To me alone came floating as it were
across the barriers of the previous
Birth the sad wailings of a forsaken Lalita.
I came running to thee
Breathlessly,
Martyrdom, the chariot of fire, all went
a-begging, the blood-red flag cried'
in the wilderness,
I indulged in a world of luxury and felicity
in secretly worshipping thee in my bosom.
To narrate the sequel I lack language today,
Today I have no heart, no tears, no strength,
no hope.
What I say today is no song, it is but
a blood-red message of a bleeding
heart embalmed in tears.

Yet keep this little bit in mind, Dear,
that from door to door
Baffled I returned
And came to thee for thyself as the Summumbonum .
of my life,
In return for the whole world of my hope and
love and affection.
I worshipped thee, O my unkind Beloved.
thou worshipper!
Methought thou wouldst smilingly take
charge of one who was too wild for the world.
Thou wouldst tame the rebel of the universe
Quite easily by dint of love alone.
Methought for the glory of conquering the
unruly and unconquerable [end of page 139]
the heart would be illumined with an
uncommon lustre, and then one day
Thou wouldst infuse celestial fire
into my arms
And become the embodied victory of this Rebel.
I harboured a hope, I had power, too,
to tear asunder the universe
And place the same under thy rosy feet
as a culled red lotus for an offering
But alas! Where art that 'thou'? Where
is that heart?
Where's that inalienable bond of attachment
between two hearts?
This 'thou' of today art not that 'thou' to be sure;
Today I find thou too art deceitful,
Thou too clammiest to be victorious by
means of falsehood!
Thou dost want to give me something,
retaining the remainder for another,
Unfortunate woman! I laugh out my soul!
Whom dost thou want to deceive?
In my bosom is ever awake the true Divinity,
His eyes are penetrating, they can see
into the heart of things,
And most minutely search its inmost recesses.
Infidelity fouls thy offering today, Dear,
Today thou dost try to deceive him
Whom one day didst thou give all thy heart and soul.
Thus I ponder, whose fault it was
That in thy spotless heart
Was kindled this death-provoking light
Yet I wonder is it true?
Thou too, a deceiving self?
If it were so, then O witch!
Let it be true, O wicked one!
Let full light show thy false world in bold relief.
Myself, thyself, the sun, moon, stars,
Let all be false,
Then, then, O alluring Phantom,
Give to thy contrived world a false gleam
As I look at thy face today, [end of page 140]
Shame strikes me like a thunderbolt
As I remember how didst thou disregard
and neglect me, I do remember my shameless ness, too�
Today I die before my death,
I feel, I must cry aloud, 'Open thy womb, Mother
Earth!
And take into darkness thy neglected.
and dust-covered son from the light
of the day that throws his shame into
prominence�
Yet many a time I came with hope
But alas! whenever I look at that face
Ah me ! where's that worshipping damsel,

Where's that forlorn anchorite?
The same accustomed disregard I see,
And the same face devoid of expression.
There's no love lost, but a game
. to ride rough-shod over a heart�
My bosom bursts under the load of disgrace!
Alas! What cruel game is this, between hearts!
These girls tread a bleeding rosy breast
Under their feet which seem dyed with lace.
They claim to be goddesses, they are greedy
and want to usurp the worship of all!
For them is not the single-minded devotion
of a lover, nor the complete surrender
of a worshipper �
Hence, in the name of true devotion,
their timid heart is so awfully frightened,
Frailty, thy name is Woman! She does
Not like to nestle round one bosom.
She is a goddess, she is greedy, the
more she is worshipped, the more she
wants worshippers.
Her voracious mind
Is not gratified with one, one is
not sufficient for her,
She seeks many
My creator-Lord received from me not such [end of page 141]
worship as was offered to her, yet she
deceived me!
I do realize, in the end, that there comes
encircling darkness as deep as death
as my companion,
So my forlorn heart out of the agony
of bitter pleasure thunders out:
Why then, O my mind, for whom shouldst
thou go lamenting abroad?
Blaze forth now, burning like the �
terrible eyes of the god of Destruction,
Clap thy hands striking terror! Fan
the bloody flames of the eternal fire
of thy Rebellion!
Let the fiery Chariot beat thy
all-destroying trumpet!
Hurl thy battle-axe and trident!
Storm this citadel of Falsehood!
Bring poison made of blood and .
nectar, seize death by the throat!
Let this false world under thy accursed
heavy agonizing wheel be crushed to powder.
In my throat there's today so much venom;
so much wrath
Yet, Nymph!
At intervals I recall�
I did not love thee
Till I saw thy light red with passion
and embosomed in thy breast,
Thou hadst all the time
Sought my love and played the
Begga-maid at my door,
Till then a small neglect resulting in thy
outraged feelings of rebellion would
have caused a flood of tears to
arise in thine eyes, and agonized
thy soft and sweet heart.
For a small bit of affection, for a tiny caress
Thou didst many a night and many
a day keep by my side on sleepless pillow
I did not vouchsafe to look at thee. [end of page 142]
Is this, then, by way of revenge? .
After conquering me by means of falsehood.
Thou hast heaped disgrace and deceit
upon my head and stopped my breath.
Today I wail from the lap of death�
O Heartless! What false cruel game
is this with regard to a heart?
After a world of love, how canst
thou hurl so much disregard,
O women?
Such a blow is man's job,
I knew, we, men, alone could inflict such injuries
Methought, the gift of a spotless fair Nymph
Finds itself in a single delicious
Moment irrevocably in the bosom of her lover,
And thus she loses her separate entity.
for all Eternity,
It is a vain belief!
Zephyr only makes the flower blossom,
The honey-making bee comes and deflowers it
The former is a type of chivalry;
Love and not the body of the beloved
. is all-in-all to him!
The latter goes by Aromatic and knows
how to ravish the blooming tender
heart of the flower
Myself, the sound Wind a traveler
the end of at spring I depart
For that deathless undiscovered country'
. . of Eternal Night!
On this even of departure my eyes are
filled with tears of joy.
As I feel how happy am I today.
Thou hadst loved me before I loved thee
The soft crimson light of thy maiden heart
From kissed my breast and Jace.
From recollections today of that ardent
happiness a deluge of sensations sweet
inundates the broken heart of this hungry one! [end of page 143]
Remembering that love and felicity of
those golden days
I feel my life is full - I sink in the
grave contented and blessed �
Unsolicited, thou alone didst love me.
In happy remembrance of that piece of joy,
I with my death-black lips
print now a thousand full kisses upon thy
dear name!

Remembering me,
If one night, Dear,
While in sleep pillowed upon one's breast
Thou dost feel a pain in thy bosom without cause,
Take it that dear and gone the impediment!
None else shall come back
In wild ecstasy to kiss thy lotus-feet�
Dead is he- the self-willed, discontented
ever-selfish, greedy �
But he is immortal - thy love hath
bestowed immortality upon the poet
Who like the deathless Nilkantha hath
Swallowed the ocean of pain. . ,

No comments:

Post a Comment